সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে গেছে বামনডাঙ্গা জমিদার বাড়ি


নুরুল আলম ডাকুয়া,সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি: 

বামনডাঙ্গা জমিদার বাড়ি। শুধু সংরক্ষণের অভাবে মুছে গেছে শেষ চিহৃটুকু। ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্থাপনাটি নতুন প্রজন্মের জন্য প্রবীণদের কাছে গল্পের খোরাকে পরিণত হয়েছে। অথচ সময়মতো পদক্ষেপ নিলে স্থাপনাটি হতে পারত একটি দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থান। নতুন প্রজন্ম পেত ইতিহাস জানার সুযোগ। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নে ঐতিহাসিক এ জমিদার বাড়ির অবস্থান। বাড়িটিতে ছিল অতিথিশালা, রাজদরবার, দুর্গা মন্দির, তিনটি পিরামিড সদৃশ মঠ, খাজনা আদায়ে ট্রেজারি, গো-শালা ও হাতিশালা। স্থাপনা তৈরি হয়েছিল ইট, শুরকি ও লোহা দিয়ে। রয়েছে তিনটি দীঘি। বর্তমানে দীঘি ছাড়া বাকি সব বিলীন। কথিত আছে, একটি দীঘিতে সারারাত সোনার চালুনি ও আরেকটিকে কালো পাথর ভেসে থাকত। কালো পাথর ভাসাকালে পানির রঙও কালো হয়ে যেত। আর সোনার চালুন ও কালো পাথরের ভয়ে দীঘিতে অনেকে নামতে ভয় পেতেন। বর্তমানে জমিদার বাড়ির জমিতে সর্বানন্দ ইউনিয়ন ভূমি অফিস, মসজিদ, প্রাথমিক স্কুল, দুটি আশ্রয়ণ কেন্দ্র ও একটি বাজার রয়েছে। খাসজমির মধ্যে ৪৭ দশমিক ২৪ একর জমি ১৬৮ জনকে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। ৩৫ শতাংশ জমি এখনো বন্দোবস্ত দেওয়া হয়নি বলে ইউনিয়ন ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়। তিনটি দীঘির মধ্যে একটি আশ্রয়ণ কেন্দ্রের মানুষ মাছ চাষ করেন ও বাকি দুটি ভূমি অফিসের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জমিদারদের সঙ্গে চলাফেরা করেছে এমন শতবর্ষী প্রবীণ আবু বকর সিদ্দিক স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কেঁদে কেঁদে বলেন, জমিদার শরৎ রায় চৌধুরী,তার মেয়ে জমিদার সুমতি বালা চৌধুরী (সুনীতি), জমিদার বীপিন রায় চৌধুরী, তার দুই ছেলে জমিদার মনিন্দ্র রায় চৌধুরী ও জমিদার জগৎ রায় চৌধুরী সবারই জমিদারি আমি দেখছি। তারা আমাকে খুব স্নেহ করতেন, প্রজাদেরও ভালোবাসতেন। জমিদারি চলে যাওয়ার পর জমিদার মনিন্দ্র রায় চৌধুরীসহ অন্যরা এক এক করে কলকাতা চলে যান। জমিদার জগৎ রায় এখানেই (বামনডাঙ্গা জমিদার বাড়ি) মারা যান। তবে বাড়ি-ঘরগুলো ভেঙে ফেলায় খুব কষ্ট পেয়েছি। জানা যায়, জমিদার কৃষ্ণ কাস্ত রায় চৌধুরীই বামনডাঙ্গার প্রথম জমিদার ছিলেন এবং তিনিই এ জমিদার বাড়ির পত্তন করেছিলেন। জনশ্রুতি রয়েছে, গৌড় বংশীয় ব্রাহ্মণ কৃষ্ণ কান্ত রায় চৌধুরী সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গায় বসতি স্থাপনের পাশাপাশি জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সময়ে বামনডাঙ্গা জমিদারের সুনাম ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি প্রজাদের মনে সুখ ও শান্তি বিরাজমান থাকায় এলাকাটির নামকরণ হয়ে যায় সর্বানন্দ। বামনডাঙ্গা জমিদার পরিবারের অতীত বংশধরদের সঠিক নাম পরিচয় না জানা গেলেও নবম কিংবা দশম বংশধরের নাম ব্রজেশ্বর রায় চৌধুরী। তিনি একসময় জমিদারি লাভ করেন। তার মৃত্যুর পর একমাত্র ছেলে নবীন চন্দ্র রায় চৌধুরী জমিদারি গ্রহণ করেন। মূলত তার জমিদারি আমলেই বামনডাঙ্গা জমিদারের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। নবীন চন্দ্র রায়ের দুই ছেলে ছেলে শরৎ চন্দ্র রায় চৌধুরী ও বিপীন চন্দ্র রায় চৌধুরী। বাবা নবীন রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর শরৎ রায় চৌধুরী ও বিপীন রায় চৌধুরী বামনডাঙ্গার জমিদারি লাভ করেন। দুই ভাই বামনডাঙ্গার জমিদারিকে দুই ভাগ করে পরিচালনা করেন। শরৎ চন্দ্র রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার একমাত্র মেয়ে সুনীতি বালা দেবী জমিদারি লাভ করেন। জমিদারি লাভের আগেই সুনীতি বালা দেবীর বিয়ে হয়েছিল দিনাজপুর জেলার ভাতুরিয়ার প্রিয়নাথ পাকড়াশীর সঙ্গে। বলা হয়, সুনীতি বালা দেবীর একটি গাভী ছিল। ওই গাভীকে কলাপাতায় লবণ না খাওয়ালে সে দুধ দিত না। জমিদার বীপিন চন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর তার দুই ছেলে মনিন্দ্র চন্দ্র রায় চৌধুরী ও জগৎ চন্দ্র রায় চৌধুরী বাবা বীপিন চৌধুরীর জমিদারিকে দুই ভাগে ভাগ করে পরিচালনা করেন। এর মধ্য দিয়ে বামনডাঙ্গার জমিদার বংশের জমিদারি মূলত তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তবে জমিদার মনিন্দ্র চন্দ্র রায় চৌধুরী ও জগৎ রায় চৌধুরী তাদের জমিদারি সফলতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারলেও সুনীতি বালা দেবী পারেননি। ফলে জমিদার সুনীতি বালা দেবী ব্রিটিশ সরকারকে খাজনা দিতে ব্যর্থ হন। ফলে ১৯৪৬ সালে সুনীতি বালা দেবীর জমিদারি নিলামে ওঠে এবং পুর্ণিয়ার মহারাজা কৃষাণ লাল সিংহ তা কিনে নেন। এদিকে দুই ভাই মনিন্দ্র চন্দ্র রায় চৌধুরী ও জগৎ রায় চৌধুরী সাফল্যের সঙ্গে জমিদারি চালাতে থাকেন। কিন্তু ভারতবর্ষ ভাগের পর ১৯৫০ সালে পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে ঐতিহ্যবাহী এ জমিদার বংশের জমিদারির যবনিকাপাত ঘটে। জমিদারি চলে যাওয়ার পরে বড় ভাই জমিদার মনিন্দ্র রায় চৌধুরী ভারতের আসামে চলে যান ও ছোট ভাই জমিদার জগৎচন্দ্র রায় চৌধুরী এ জমিদার বাড়িতেই থেকে যান। এ বাড়িতেই ১৯৬৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তার মৃত্যু হয়। জমিদার জগৎ চন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পরে জমিদারের বংশধররা পালাক্রমে ভারতে চলে যান। বাজেয়াপ্ত হয়ে যায় তাদের সব স¤পদ।


পুরোনো সংবাদ

হাইলাইটস 8986657290384689306

অনুসরণ করুন

সর্বশেষ সংবাদ

ফেকবুক পেজ

কৃষিকথা

আপনি যা খুঁজছেন

গুগলে খুঁজুন

আর্কাইভ থেকে খুঁজুন

ক্যাটাগরি অনুযায়ী খুঁজুন

অবলোকন চ্যানেল

item