নীলফামারীর ডিমলায় ফের পাথর উত্তোলনের পায়তারা


ইনজামাম-উল-হক নির্ণয়,নীলফামারী॥
চার বছর হয় সরকারিভাবে অভিযান চালিয়ে নীলফামারীর  ডিমলা উপজেলার তিস্তা নদী সহ ব্যাক্তি মালিকানা জমি হতে বোমা মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করা বন্ধ করা হয়েছিল। এবার নতুন করে একটি প্রভাবশালী চক্র ফের পাথর উত্তোলনের পায়তারা শুরু করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ জন্য ওই চক্রটি এবার প্রকাশ্যে পাথর উত্তোলনের দাবি তুলে মঙ্গলবার সকালে উপজেলায় মানববন্ধন সহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে। 

 উপজেলার তিস্তাপাড়ের বসবাসকৃত মানুষজন জানায় পাথর উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর থেকে নদীর ভাঙ্গন এখন নেই। রাস্তাঘাট নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে। এলাকার উন্নয়ন ঘটেছে। সেখানে পুনরায় পাথর উত্তোলন শুরু হলে ফের নদী ভাঙ্গন সহ রাস্তাঘাট ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে।

তিস্তা বাংলাদেশের একটি আন্ত:সীমান্ত নদী। উজান থেকে নেমে নীলফামারীর পশ্চিমছাতনাই কালিগঞ্জ জিরো পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তিস্তা নদীর ডালিয়ায় রয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ। নদীটির বাংলাদেশ অংশে ১২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৪০ কিলোমিটার  অংশই বয়ে গেছে নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার ওপর দিয়ে। বছরের পর বছর অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে সেখানে তৈরি হয় ভাঙ্গন। হুমকীর মুখে পড়েছিল তিস্তা ব্যারাজ। ব্যারাজের উজানে পাথর তোলার কারনে নদীর মাঝখানে তৈরী হয় বালুর পাহাড়। পাথর তোলার জন্য ড্রেজিং মেশিনের মতো একটি যন্ত্র দিয়ে নদীর তলদেশে তৈরি করা হয়েছিল শতফুট গভীর খাদ। সেই খাদ থেকে পাইপ দিয়ে একসাথে তোলা হতো বালি এবং পাথর।জালের মতো একটি ছাঁকনি দিয়ে পাথর আলাদা করে বালিটি নদীর পাড় ঘেঁষে জমিয়ে রাখা হয়। আর ট্রাক ভর্তি করে নিয়ে যাওয়া হয় নুড়িপাথর। নদীর মাঝখানে খালি ড্রাম দিয়ে তৈরি পাটাতনের ওপর বসানো এসব যন্ত্রকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় 'বোমা মেশিন'। শুধু তিস্তা নদী নয়, নদীর ডানতীর বাঁধঘেষে সরকারি খাস জমিও দখল নিয়ে একই পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন করা হতো। অনেকে নিজস্ব মালিকা জমিতেই তৈরী করেছিল পাথর উত্তোলনের কারখানা। ফলে  নদী ও পথঘাট ভাঙ্গন এবং মাটি দেবে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছিল। 

এলাকাবাসী জানায় ২০১৬ সালের আগে থেকে দেদারছে উপজেলা জুড়ে প্রভাবশালী চক্র তিস্তা নদী সহ সরকারি খাসজমি ও তাদের নিজস্ব মালিকানা জমি হতে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন শুরু করে। ফলে তিস্তা নদীভাঙ্গনে বছরের পর বছর বারবার বাস্তুহারা হয়ে কয়েক হাজার মানুষ আশ্রয় নেয়  বিভিন্ন স্থানে, অনেকের আশ্রয় হয়েছে বাঁধের রাস্তার ধারে। নদীর ভাঙ্গনে গত চার বছরে দু'বার বাড়ি হারানো এক কৃষক হারিস মোল্লা আক্ষেপ করে বলছিলেন ভাষানীর চরটি আজ বিলিন। চরটির কোন অস্তিত্ব আর নেই। বসতভিটা হারানোর ব্যথা আমি বুঝি। চরখড়িবাড়ি এলাকায় অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের কারণে নদীগর্ভে বিলিন হয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একতার বাজার। এ ছাড়া বিজিবির ক্যা¤প ভাঙনের ফলে ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়। পাশাপাশি এই ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার মানুষ হয়ে পড়ে গৃহহারা। পাথর উত্তোলন করে পরিবহনের কারণে উপজেলার সবকটি কাঁচা-পাকা রাস্তার বেহাল দশা হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। উপজেলার পাথর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিকবার দফায় দফায় বৈঠক করে তিস্তা নদী থেকে অবৈধ পাথর বালু উত্তোলন না করার জন্য বারবার অনুরোধ জানানো হলেও এলাকার একটি অসাধু মহল তা কর্ণপাত না করে তারা ভারী (বোমারু) মেশিন দিয়ে তি¯াÍ নদী থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করে আসছিল। মানুষের লোভ যে কীভাবে একটি নদীকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ তিস্তা নদী। বছরের পর বছর অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করার ফলে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হয় এই নদীর গতিপথ, আর ভাঙ্গনের ফলে ঘরবাড়ি হারায় সাধারণ মানুষ।

পাথর তোলা নিয়ে  অনেকেই বলেন "পাথর তুলি এলোমেলো হয়া গেছে নদীটা।""ঐপাশে পাথর তুলি বালি ফেলি দিছিল। নদীটা তখন এইদিকে চলি আসছে। পরে বন্যাত বাড়ি ভাঙ্গি গেছে"। আবার নদীর বাঁধ ঘেষে ও রাস্তার ধারে ব্যাক্তি মালিকানা জমি দাবি করে  অনেক প্রভাবশালী অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করায় রাস্তাঘাট সব চুরমার হয়া যায়।  ইয়াসিন আলী নামের একজন বললেন তাঁর বাড়ি ভেঙ্গে গেছে তিনবার।  পাথর তুলে উপজেলার সব তছনছ হয়ে গিয়েছিল বলে ইয়াসিন আলী অভিযোগ তুলেন।সে সময় এলাকাবাসী পাথর উত্তোলন বন্ধ করার দাবি তোলে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে একাধিবার খবর প্রকাশ হয়। শুধু ঘরবাড়ি হারানোই নয়, বোমা মেশিনের কারণে নদীর তলদেশে যে কয়েকশ ফুট গভীর খাদ এবং বালির পাহাড় তৈরি হয়। নদীর আশেপাশের চাষযোগ্য জমির মাটি কেটেও চলে পাথর উত্তোলন। এভাবে গত কয়েক বছরে ৫০ হেক্টরের বেশি কৃষিজমিও নষ্ট হয়ে গেছে।

আগে অযান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নদীর তলদেশ থেকে পাথর উত্তোলন হলেও বোমা মেশিন নামে পরিচিত যন্ত্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে এই পাথর উত্তোলন চলে । এ সংক্রান্ত একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনও সরকারের হাতে রয়েছে। প্রতিবেদনে ¯পষ্টভাবেই বলা হয়েছিল, শতাধিক বোমা মেশিনের মাধ্যমে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনে পাথর উত্তোলন সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছে স্থানীয় সরকারদলীয় কিছু নেতা-কর্মীরা, যাদের সাথে রয়েছে বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীরাও।

এলাকাবাসী জানায় ২০১৬ সালে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিট্রেট ,বিজিবি ও পুলিশের যৌথ অভিযানে ডিমলা উপজেলা থেকে সকল প্রকার পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেয়া হয়। এ নিয়ে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ করার পর উপজেলার সকল রাস্তাঘাট সরকারি ভাবে নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে। উপজেলায় এখন আর কোন ভাঙ্গাচুরা পথঘাট নেই। গ্রামীন কাচারাস্তাগুলোও মাটি ভরাট করে সুন্দর করা হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি আর কোনভাবেই যেন বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন  করতে দেয়া না হয়। ফের পাথর উত্তোলন শুরু হলে পুনরায় উপজেলার রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে যাবে। তিস্তা নদীর ভাঙ্গনে ফের পথে বসবে হাজারো পরিবার। 

আজ মঙ্গলবার উপজেলায় ব্যক্তি মালিকানা জমি থেকে নুড়ীপাথর উত্তোলনের দাবী তুলে নুড়ী পাথর উত্তোলন ব্যবসায়ী ও শ্রমিক ঐক্য পরিষদের ব্যানারে মানববন্ধন করা হয়। 

নুড়ী পাথর উত্তোলন ব্যবসায়ী ও শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি আব্দুল খালেক, সাধারন স¤পাদক একেএম শামীম, জাহাঙ্গীর আলম, আমিনুল ইসলাম ,সফিকুল ইসলাম, দুলাল হোসেন, নিজাম উদ্দিন সরদার মানববন্ধনে তাদের বক্তব্যে বলেন শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ব্যক্তি মালিকানা জমি হতে বৈধভাবে নুড়ী পাথর উত্তোলনের দাবিতে তারা এই কর্মসুচি পালন করছে। তারা জানায় ২০১৫ সালে থেকে উপজেলার ৩৯টি ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান সরকারকে ইজারা মুল্য, সরকারী ভ্যাট আয়কর, জামানত জমা দিয়ে পাথর উত্তোলনের আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু তারা সেই অনুমতি পায়নি। এতে তারা ব্যাপক 

ক্ষতির সন্মুখিন হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্য নুরী পাথর উত্তোলনের অনুমতির দাবী করেন তারা।এদিকে মানববন্ধন শেষে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায়কে স্বারকলিপি প্রদান করে। #


পুরোনো সংবাদ

হাইলাইটস 8298858619995050947

অনুসরণ করুন

সর্বশেষ সংবাদ

ফেকবুক পেজ

কৃষিকথা

আপনি যা খুঁজছেন

গুগলে খুঁজুন

আর্কাইভ থেকে খুঁজুন

ক্যাটাগরি অনুযায়ী খুঁজুন

অবলোকন চ্যানেল

item