কিশোরগঞ্জে শ্যামলীকে হত্যা॥ টাইগার স্বামীর মায়া কান্নার অভিনয় পুলিশের তদন্তে ঢোপে টিকলোনা


কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি॥ এতো অভিমান- তাই বলে নদীতে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে হবে। ৫ বছরের মধুর সংসার। কিন্তু সব সুখ স্বপ্ন ফেলে দিয়ে স্ত্রী চলে গেল না ফেরার দেশে। স্ত্রী শ্যামলীর(২৫) মৃত্যুর জন্য স্বামীর করুণ আহাজারী। এমন করুণ বিলাপ করছিলেন যে স্বামী আশেকুর ওরফে টাবাগারের(৩২) বিলাপ যেন থামতেই চাইছিল না। কি দোষে আত্বহত্যা করল সে? পারলে পুলিশের সামনে তার কলিজাটাও বের করে দেয় স্ত্রী জন্য স্বামী। তার আকাশ ভারী করা বিলাপে নীলফামারীর কিশোরীগঞ্জ থানা পুলিশও স্ত্রী হারানো বেদনায় ভরা স্বামীকে শান্তনা দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি।
কিন্তু সমস্যা বাধলো শ্যামলীর মরতেহ উদ্ধারে সময় সুরতহাল রির্পোটে। স্পষ্ট ভেসে উঠলো পাজরে আঘাতের চিহৃ। বিষয়টি জানালো হলো পুলিশ সুপারকে। পুলিশ সুপারের পরিকল্পনা মাফিক ঠান্ডা মাথায় কিশোরীগঞ্জ থানা পুলিশ এগুতে থাকতো। হত্যার শিকার শ্যামলী কিশোরীগঞ্জ উপজেলার নিতাই ইউনিয়নের মৌলভীর হাট এলাকার আসাদুজ্জামানের মেয়ে। শ্যামলী হত্যাকান্ডের বিষয়টি দ্রুত তদন্তে বেরিয়ে আসে মুল মোটিভ।
এ নিয়ে আজ শুক্রবার(১০ জুলাই/২০২০) সন্ধ্যায় পুলিশ সুপার মোখলেছুর রহমান(বিপিএম,পিপিএম) সংবাদ সম্মেলন করে জানালেন তদন্তে অতি সহজেই বেরিয়ে এলো স্বামী-শ্বশুর ও শাশুড়ি শলা পরামর্শ করে কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে লাশ নদীতে ফেলে আসে, লাশটি পানিতে ভেসে যাবে অথবা মাছ খেয়ে নেবে এমন ধারণা থেকে। কিন্তু হত্যাকান্ডটি ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে চাইলেও পারেনি তারা।
৬ জুলাই চারালকাটা নদীর ব্রীজের নিচে লাশ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশ গিয়ে সেখানে হাজির হয় এবং লাশটি শ্যামলীর বলে তার বাবা শনাক্ত করেন। ঘটনার পর থেকে রহস্য উদঘাটনে কাজ শুরু করে পুলিশ। এ ঘটনায় শ্যামলীর মা বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা করেন।
হত্যার ব্যাপারে স্বামী ও শ্বশুরকে আটক করা হলে তারা আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। এসপি বলেন, এটি একটি নির্মম ঘটনা। অত্যন্ত নিষ্ঠুর একটি কাজ করা হয়েছে।
নীলফামারীর কিশোরীগঞ্জ উপজেলার মুশরুত বালাপাড়ার এলাহী বক্স ওরফে কাল্টু মামুদের ছেলে আশেকুর ওরফে টাইগার। তার স্ত্রী শ্যামলীর অর্ধগলিত লাশ গত ৬ জুলাই দুপুরে উপজেলার বেলতলীর ব্রীজের কাছে চাড়ালকাটা নদীর ধারে উদ্ধার করে পুলিশ। শ্যামলীর মৃত্যুর মোটিভ খুঁজতে গিয়ে পুলিশের চোখে ধরা পড়ে শ্যামলীর গলিত লাশ উপুর হয়ে পড়ে ছিল। চৌকশ তনন্তকারী কর্মকর্তা ওসি (তদন্ত) মফিজুল ইসলামের সন্দেহের তীর ওই অভিনয়কারী স্বামীর উপর যায়। অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর অবশেষে থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসে। পরে নীলফামারী চিপ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের কাছে স্বামী আশেকুর ও তার বাবা জবানবন্দীতে শ্যামলীকে হত্যার দায় অকপটে স্বীকার করেন। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকান্ডের বর্ণনাকালে আশেকুর ওরফে টাইগার বলেন, আমি আমার জৈবিক চাহিদা মিটানোর জন্য গত ৩ জুলাই রাতে স্ত্রীকে প্রস্তাব দিলে সে প্রত্যাখান করে। বাড়ীর নলকুপটি নষ্ট হওয়ার কারণে চাচার বাড়ীতে থাকা নলকুপে সে গোসল করতে পারবে না বলে জানায়। ওখানে যেতে নাকি তার শরম লাগে। এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের ঝগড়া লাগে। এ নিয়ে আমি তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে তার বাবার বাড়ি চলে যেতে বলি। কিন্তু স্ত্রী বাবার বাড়ি যায়নি। পরের দিন সকাল ৪ জুলাই স্ত্রীকে বাড়িতে দেখে উত্তেজিত হয়ে এক পর্যায়ে তাকে মারপিট করি। এরপর একই দিন রাত পনে আটটায় তাকে বাঁশের খুটি দিয়ে ঘরে ভেতর গলায় ও পাজরে আঘাত করি। এতে সে বিছানার উপর পড়ে যায়। এরপর পরীক্ষা করে দেখি স্ত্রীর শ্বাস নেই। সে মরে গেছে। ঘটনাটি বাবা এলাহী বক্স ও মা আশফিয়া খাতুনের সঙ্গে বুদ্ধি করি। এরপর রাত গভীর হলে শ্যামলীর লাশ গোপন করার লক্ষ্যে কাপড় দিয়ে বেধে বাবা সহ আধা কিলোমিটার দুরে চারালকাটা নদীতে ফেলে দিয়ে আসি। পরেরদিন প্রচার করা হয় শ্যামলী রাগ করে সন্তান রেখে বাবার বাড়ি চলে গেছে। ঠিক এর একদিন পর ৬ জুলাই সকাল ১০টায় এলাকাবাসী নদীতে একটি লাশ ভেসে থাকতে দেখে খবর দেয়। এমন খবর পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে নাটক সিনেমার মতো অভিনয় করে সে স্ত্রীর লাশের কাছে ছুটে গিয়ে বিলাপ করতে থাকি। কিন্তু পরে হত্যার ঘটনা পুলিশের কাছেও খুলে বলি।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার জানান, ঘটনার পর তিনি বিষয়টি নিয়ে ২৪ ঘন্টা মনিটরিং করছিলেন। পাশাপাশি দিক নির্দেশনা প্রদান করছিলেন। এ ঘটনায় শ্যামলীর মা বাদী হয়ে ৬ জুলাই একটি মামলা দায়ের করেন( কিশোরীগঞ্জ থানার মামলা নং-০১,তারিখ-০৬/০৭/২০২০ইং ধারা-৩০২/২০১/৩৪ দঃ বিঃ)। ওই মামলায় প্রথমে আটক করা হয় শ্যামলীর স্বামী ও বাবাকে। শ্যামলীর আত্মহত্যাকে তারা আবার সামনে এনে বিলাপ করছিল। কিন্তু থানায় তাদের বসিয়ে রেখে সময় যতই পাড় হচ্ছিল তারা ততই নিজেরাই নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল। তাদের খাওয়া দাওয়া সহ সম্মান করা হচ্ছিল যথা নিয়মে। এক পর্যায়ে রাত বাড়লে তারা ঘুমাতে পারছিলনা। ছটপট ছটপট করছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধীরে ধীরে বাবা ছেলে মুখ খুলতে থাকে। এই ঘটনার দ্রুত অভিযোগ আদালতে দাখিল করা হবে বলে উল্লেখ করেন পুলিশ সুপার। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(প্রশাসন) আবুল বাশার মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(নীলফামারী সার্কেল) রুহুল আমিন, নীলফামারী থানার ওসি মোমিনুল ইসলাম, সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহমুদ উন নবী, ডিআইও-১ লাইছুর রহমান প্রমুখ।

পুরোনো সংবাদ

নীলফামারী 74848245935913462

অনুসরণ করুন

সর্বশেষ সংবাদ

ফেকবুক পেজ

কৃষিকথা

আপনি যা খুঁজছেন

গুগলে খুঁজুন

আর্কাইভ থেকে খুঁজুন

ক্যাটাগরি অনুযায়ী খুঁজুন

অবলোকন চ্যানেল

item