পীরগঞ্জে স্মরণকালের ভয়াবহ শিলাবৃষ্টি

হাজার হাজার ঘরবাড়ী ও ক্ষেতের ফসলের ক্ষতি

ভাই মুই এ্যালা ছ’ল-পলগুলা  নিয়া কোনটে থাকো।

মামুনুর রশিদ মেরাজুল, পীরগঞ্জ(রংপুর):
পীরগঞ্জে স্বল্প সময়ের মধ্যে স্মরণকালের ভয়াবহ শিলাবৃষ্টি আর কালবৈশাখীর ঝড়ে কয়েক হাজার ঘর-বাড়ীসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে নারী ও শিশুসহ ৪ শতাধিক লোকজন আহত হয়েছে।শুক্রবার দুপুরে উপজেলার চৈত্রকোল, মদনখালী, বড়আলমপুর, চতরা ও কাবিলপুর ইউনিয়নে ওই শিলাবৃষ্টি হয়।
 প্রত্যক্ষ দর্শিরা জানান, শুক্রবার জুম্মার নামাজের আযান দেয়ার পূর্ব থেকে পশ্চিম আকাশ কালা হয়ে আসে। এরপর আযান শেষ হবার পরপরই প্রথমে ধুলী ঝড় তারপর  ঝড় বাতাস ও বৃষ্টি শুরু হয়। প্রথমে পড়তে থাকে ছোট শিলা । তারপরই শুরু হয় ছোট-মাঝাড়ী ও বড়বড় শিলার আঘাত। ২ থেকে ৩ মিনিট ধরে বড়বড় শিলা আঘাত হানে বর্নিত ইউনিয়ন সমুহের প্রতিটি গ্রামে। কাল বৈশাখীর ঝড় আর শিলা বৃষ্টির আঘাতে কয়েক হাজার বাড়ী ঘরের টিনের চালা ফুটা হয়ে চালনের রুপ নেয়ায় ঘরগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ওইসব ঘরবাড়ির মালিকরা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে দুর্বিসহ দিন কাটাচ্ছে। মাঠের আগাম জাতের ইরি-বোরা ধান,ভুট্রা,কলাসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চতরা ইউপির চেয়ারম্যান এনামুল হক শাহিন বলেন,৩/৪ মিনিটের শিলা বৃষ্টিতে চতরা ইউপির বিভিন্ন গ্রামে  দেড় সহস্রাধিক ঘরবাড়ী ও মাঠে ফসলের কমবেশী ক্ষতি ও অর্ধ শতাধিক লোকজন আহত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা করা হচ্ছে। ঘোনাচতরা,আগাচতরা,কাঙ্গুরপাড়া,বিরাহিমপুর, মাটিয়ালপাড়া,কাঠালপাড়া, সমশেরপাড়া, মায়াগাড়ী গ্রামে ক্ষতি হয়েছে সর্বাধিক। আহতরা হলেন,বড় বদনাপাড়ার, সিরাজুল, রোহনা খাতুন, শ্রাবনী আক্তার,চকভেকার আনার মিয়া, সমশেরপাড়ার ফিরোজা বেগম, ফারজানা বেগম, গিলাবাড়ীর সাজু মিয়া,কাটাদুয়ারের রাশেদা ,আব্দুল হালিম, জাহাঙ্গীরসহ অর্ধ শতাধিক আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় চকভেকা গ্রামের মোজাহার আলীর শিশু কন্যা নুসরাত জাহানকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অন্যান্য আহতদেরকে স্থানীয় চিকিৎসকগন চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন।
কাবিলপুর ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম জানান, গত শুক্রবারের শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে কাবিলপুর ইউপির ২৩টি গ্রামের ঘরবাড়ী ও মাঠে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। শিলার আঘাতে আহত হয়েছে অনন্তত দু’শতাধিক।তন্মধ্যে টুকনিপাড়া,শেরপুর,জুনিদপুর,কাবিলপুর,আযমপুর,হলদীবাড়ী, গাংজোয়ার, পদ্মহার ও শ্রীরামপুর গ্রামে  ক্ষতির পরিমান বেশী। শুক্রবারের শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে ক্ষতির পরিমান গত বন্যার চেয়ে অনেক বেশী । যা চোখে না দেখলে বুঝানো কষ্টকর। গ্রামের ধনী গরীব সকলে এই ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। দুর্ভোগ বেড়েছে হত দরিদ্র, নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের।
টুকুরিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মন্ডল জানান, শুক্রবারের কাল বৈশাখীর ঝড় আর শিলার আঘাতে ইউনিয়নের ২২ টি মৌজার ৬ হাজার ৩৬৭টি পরিবারের অধিকাংশরই ঘরের টিনের চালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে ক্ষেতের ফসল। বড়-বড় শিলার আঘাতে ৩/৪ মিনিটের মধ্যে ঘরের চালার টিনগুলো খই চালার মত হয়েছে। মানুষ ঘরের মধ্যে থাকলেও চালের টিন ও ছাদ ভেদ করে শিলা ঘরের মধ্যে পড়ায় নারী ও শিশুসহ অর্ধ শতাধিক লোকজন আহত  হয়।  আহতরা হলো-আটিয়াবাড়ীর  রেজাউলের স্ত্রী মোর্শেদা (৩৫), ভগবানপুরের মজিবরের ছেলে-ছাদেকুল(৪৫), মৃত-আলেফ উদ্দিনের স্ত্রী দুলালী বেগম(৫৫),বিছনার আব্দুল খালেকের স্ত্রী বিউটি(২০),শরিফুলের প্রতিবন্ধি কন্যা শরিফা খাতুন,ছাতুয়ার নায়েব আলীর স্ত্রী-রুলী বেগম(৪০), হাসেন আলীর স্ত্রী মঞ্জুরা বেগম (৩৫),অর্ধলক্ষাধিক টাকা মুল্যের তার একটি গরুও মারাগেছে। একই গ্রামের সাত্তারের স্ত্রী-মাজেদা (৪০), আব্দুল জব্বারের ছেলে-মতিয়ার রহমান, আয়নালের ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়–য়া শিশুকন্যা আইরিন খাতুন,মাধবপুরের আশরাফুলের স্ত্রী বিলকিছ বেগম, ছাতুয়ার আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী- মাজেদা বেগম(৪০), মোনাইল গ্রামের আব্দুস সালামের শিশুপুত্র কবির হোসেন (১২), মৃত-নয়া মিয়ার স্ত্রী- রাহেলা বেওয়া(৬২), কাশিপুরের মালেকুলের স্ত্রী- নার্গিস বেগম (৩৫),টুকুরিয়া কয়লাপাড়ার-রমজান আলীর স্ত্রী-পাকিজা বেগম(৩৩) ও তার মা-রওশন আরা বেওয়া (৫৫)। মোনাইল হাফেজিয়া মাদ্রাসার ছাত্র সজিব মিয়া,আব্দুল হাই এর ছেলে-ফজলুল হক,দুধিয়া বাড়ীর খেতাবের ছেলে  আব্দুস সালাম(৫৬),সুজার কুঠির মাতাবের স্ত্রী-আম্বিয়া(৫০),ফজলুল হকের স্ত্রী-রাশেদা বেগম(৩৫), টিওরমারীর আফজালের স্ত্রী- ছকিনাসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়। আহতদের মধ্যে মোর্শেদা বেগম ও দুলালীকে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপে¬ক্সে এবং আতোয়ারের শিশু কন্যা আতিকা খাতুনকে আশংকাজনক অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তিকরা হয়। অধিকাংশ আহতদেও মাথা ফেটেছে, কারো কারো থেতলে গেছে। স্থানীয় চিকিৎসকগন আহতদেও চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ওই ইউনিয়নের টুকুরিয়া, মাধবপুর,আটিয়াবাড়ী,দুধিয়াবাড়ী, বটপাড়া,হরিনা,পার বোয়ালমারী,গন্ধর্বপুর,ছাতুয়া, মোনাইল, গোপীনাথপুর, টিওরমারী,কোমরসই, তরফ মৌজা, বিছনা গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে , মাঝে মধ্যে ২/১ টি ছাড়া প্রায় সব বাড়ীতেই  ঘরের চালার টিন  শিলার আঘাতে ক্ষত বিক্ষত ও বড়বড় ফুটো হয়ে ঝাঝরা হয়েছে। টুকুরিয়া ইউনিয়ন আ’লীগের সম্পাদক রবিউল ইসলাম বলেন, শুক্রবার রাতের বৃষ্টিতে ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ ঘরেও থাকতে পারেনি। মাঠের ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি বসতবাড়ীর ঘরের চালার টিন শিরার আঘাতে এভাবে ক্ষতির দৃশ্য বিগত শত বছরেও কেউ দেখেছে বলে মনে হয়না। শুক্রবার বিকেলে পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র আবু ছালেহ মো: তাজিমুল ইসলাম শামীম বর্ণিত ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্থ গ্রামসমুহ পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সদস্যদের শান্তনা দিয়ে বলেন, এটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ধর্যের সাথে আমাদেও সকলকে দুযোর্গ মোকাবেলায় অসহায় মানুষের পাশে দাড়াতে হবে। তিনি জাতীয় সংসদের স্পীকার ও পীরগঞ্জের সংসদ সদস্য ড.শিরীন শারমিন চৌধুরীর পক্ষে  ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং ক্ষতিগ্রস্থ অসহায় পরিবারকে সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দেন।
ছাতুয়া গ্রামের মৃত-লতিব উল্যার পুত্র আব্দুল জব্বার(৯০) ও আমেনা বেগম(৮০) কাবিলপুর ইউপির শ্রীরামপুর গ্রামের খাজু প্রধানের সাথে কথা হলে তারা বলেন, এটা আল¬াহ তায়ালার দেয়া গজব। এত বড় শিলা নিজেদেও জীবনেই শুধু নয় বাপ দাদারও দেখেনি।
ছাতুয়া গ্রামের ছোট কৃষক আলম উদ্দিনের ছেলে আব্দুস সাত্তার (৫০) বলেন, ভাই মুই এ্যালা ছ’ল-পলগুলা  (ছেলে -মেয়েদের) নিয়া এখন কোনটে থাকো। বাড়ির একটা ঘরের চালের টিনও ভাল নাই সব ফুটা হচে (হয়েছে)। এমন অবস্থা শুধু আব্দুস সাত্তারের নয় । এমন অবস্থা দাড়িয়েছে বর্নিত ইউনিয়নের দরিদ্র, নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার গুলোর।


পুরোনো সংবাদ

রংপুর 8549288332990923409

অনুসরণ করুন

সর্বশেষ সংবাদ

Logo

ফেকবুক পেজ

কৃষিকথা

আপনি যা খুঁজছেন

গুগলে খুঁজুন

আর্কাইভ থেকে খুঁজুন

ক্যাটাগরি অনুযায়ী খুঁজুন

অবলোকন চ্যানেল

item