সৈয়দপুরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের সড়কগুলোর ভিন্ন ভিন্ন নামকরণের অভিযোগ

তোফাজ্জল হোসেন লুতু,সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি:
 নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরে জাতীয় নেতা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের সড়কগুলোর ভিন্ন ভিন্ন নামকরণের অভিযোগ উঠেছে। ফলে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান প্রধান সড়কের নামকরণ শহীদদের নামে করা হয়েছিল তা ভেস্তে যেতে বসেছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবাঙালি (উর্দূভাষী) অধ্যূষিত নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ সে সময় এ শহরে বাঙ্গালীরা ছিল সংখ্যালঘু। আর অবাঙালিরা (ঊর্দূভাষী) ছিল সংখ্যা গরিষ্ঠ। তাই ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে এ শহরের বাঙালিদের দুইটি শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে। এদের একটি ছিল পাক হানাদারবাহিনী আর অন্যটি ছিল তাদের সমর্থক অবাঙালিরা (বিহারী)। ফলে ওই সময়ে এই দুইটি শক্তির হাতে এখানকার অন্ততঃ দেড় সহ¯্রাধিক বাঙালি শহীদ হন। আর এ সব শহীদদের মধ্যে সাধারণ মানুষসহ সমাজসেবী, রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীও রয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী এ সব শহীদদের স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখতে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে তাদের তুলে ধরতে স্বাধীনতা পরবর্তী সৈয়দপুর শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান প্রধান সড়কগুলোর নামকরণ করা হয় তাদের নামে। সে সময় শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান সড়কটির নামকরণ করা হয় শহীদ ডা. জিকরুল হকের নামে। যিনি ছিলেন  তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমপিএ)। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গৌরবময় অবদানের জন্য সরকার ২০০১ সালে তাকে স্বাধীনতা পদক (মরনোত্তর) প্রদান করা হয়।
শহীদদের নামে নামকরণ করা অন্য সড়কগুলো হচ্ছে শহীদ ডা. সামসুল হক সড়ক, শহীদ জহুরুল হক সড়ক, শহীদ তুলশীরাম সড়ক ও শহীদ ক্যাপ্টেন মীঢ়ধা সামসুল হুদা সড়ক। পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামে সৈয়দপুরের প্রথম শহীদ মাহাতাব বেগ এর নামেও শহরের একটি সড়কের নামকরণ করা হয়। শহীদ মাাহতাব বেগ সড়ক।
এছাড়াও জাতীয় দুই নেতার নামেও শহরের দুইটি সড়কের নামকরণ করা হয়। এ সড়কগুলো হচ্ছে শেরে বাংলা সড়ক এবং বঙ্গবন্ধু সড়ক।
কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদদের নামে নামকরণ করা সড়কগুলোকে বর্তমানে যাচ্ছেতাই নামে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এখন  শুধুমাত্র শহরের শহীদ ডা. জিকরুল হক সড়ক ছাড়া অন্য সড়কগুলো ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিতি পেয়েছে।
শুধু তাই নয়, বর্তমানে শহীদ জহুরুল হক সড়ককে কামার রোড কিংবা বিচালীহাটি রোড, শহীদ তুলশীরাম সড়ককে দিনাজপুর রোড কিংবা মাড়োয়ারী পট্টি রোড, শহীদ ডা. সামসুল হক সড়ককে মাছহাটি কিংবা পুরাতন কাপড়হাটি রোড হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
 সেই সঙ্গে জাতীয় পিতার নামে করা বঙ্গবন্ধু সড়ককে রংপুর রোড, এবং জাতীয় নেতা শেরে বাংলা সড়কের নাম সিনেমা রোড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
শহীদদের নামে নামকরণ করা সড়কগুলোকে মানুষের মুখে মুখে কেবলমাত্র অন্য নামে চিহ্নিত করা হচ্ছে না। শহরের সড়কগুলোর দুই পাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানর নামে বড় বড় সাইনবোর্ডেও স্থান পেয়েছে প্রকতৃ নামের পরিবর্তনে ভিন্ন ভিন্ন নাম। যদিও নীলফামারী জেলা চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির পক্ষ থেকে অনেক আগে সৈয়দপুর শহরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব নামের সাইনবোর্ডসহ সব রকম প্রচার প্রচারণায় শহরের সড়কগুলোর সঠিক নাম ব্যবহারের আহবান জানানো হয়েছিল। কিন্তু চেম্বারের সেই আহবানে অনেকই  কোন সাড়া দেয়নি অদ্যাবধি।
এদিকে, শহীদদের নামে নামকরণ করা সড়কের নামফলকগুলো আর চোখে পড়ে না। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নামফলকগুলোর জায়গায় দখলে নিয়ে সে সব ভেঙ্গে গড়ে তুলেছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কোন কোন নামফলক আবার সড়ক সংস্কার কিংবা ড্রেন নির্মাণ ও মেরামতের সময় ভেঙে ফেলা হয়েছে। এর পর আর সেগুলো বসানোর দরকার  বলে মনে করেননি সংশ্লিষ্ট বিভাগ। এখন শুধুমাত্র একটি নামফলক চোখে পড়ে সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনের সামনে। আর সেটি হচ্ছে শহীদ ডা. জিকরুল হক সড়কের নামফলক। সেটি অযতেœ আর অবহেলায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছে।
সম্প্রতি  শহীদ ডা. জিকরুল হক সড়কের একটি  মিষ্টি দোকানের সবররাহ করা প্যাকেটের গায়ে বিকৃতভাবে সড়কটির নাম লেখা হয়। তাতে লেখা হয় শহীদ ডা. হক সড়ক। আর এর প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে সৈয়দপুর শহরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধাসহ সুধীজনসহ সর্বস্তরের মানুষ। তারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নামে করা সড়কগুলোর নাম বিকৃতি রোধে এবং যথাযথ নামে চিহ্নিত করার দাবিতে সৈয়দপুর উপজেলা প্রশাসন ও পৌর মেয়রকে স্মারকলিপি দিয়েছেন। গত বুধবার (১২ জুন) মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সন্তানদের সংগঠন ’৭১ এর পক্ষ থেকে ওই স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। একই দিন সকালে ওই দাবিতে সংগঠনটির উদ্যোগে সৈয়দপুর পৌর মেয়র বরাবরেও একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
এ নিয়ে কথা হলে সৈয়দপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. একরামুল হক সরকার বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা  দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধ করেন। অনেকে জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করেন।  মুক্তিযোদ্ধাদের নামে করা সড়কের নাম বিকৃতিভাবে চিহ্নিত করা তাদের জন্য অসম্মান ও অবমাননাকর বটে। আর এতে করে বর্তমান প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধে কার অবদান কতটুকু কিংবা তাদের সম্পর্কেও জানতে পারছেন না। তিনি সৈয়দপুর শহরের সড়কগুলোর নাম নামকরণ অনুযায়ী যথাযথভাবে চিহ্নিত করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইন বোর্ড কিংবা সব রকম প্রচার প্রচারণায় ব্যবহারের দাবি জানান। 

পুরোনো সংবাদ

সৈয়দপুর 8163803921821089532

অনুসরণ করুন

মুজিব বর্ষ

Logo

সর্বশেষ সংবাদ

শিল্প-সাহিত্য

ফেসবুক লাইকপেজ

তারিখ অনুযায়ী খুঁজুন

অবলোকন চ্যানেল

item