সড়ক দূর্ঘটনায় পা হারিয়ে মানবেতর জীবন ইঁদুলের


মেহেদী হাসান উজ্জ¦ল,ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:

মর্মান্তিক এক সড়ক দূর্ঘটনায় ডান পাঁ হারিয়ে এখন পঙ্গু ইদুল মিয়া (৪৫)। একই দূর্ঘটনায় দুলাল (২৫) নামে এক যুবক ঘটনাস্থলেই নিহত হন।  পা হারিয়ে পঙ্গু জীবণ নিয়ে বর্তমানে মানবেতর অবস্থায় জীবন যাপন করছেন ইদুল মিয়া। আজও সেই দূর্ঘটনার কথা মনে হলে সিউরে ওঠেন তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ইঁদুল তার আয়ের ওপর নির্ভর করত পরিবারের ভরণ-পোষণ। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা এলোমেলো করে দিয়েছে ইঁদুলের জীবন।

পঙ্গু হয়েও ইদুল কারো কাছে হাত পাতেনি, তবুও থেমে থাকেনি সে, জীবিকার তাগিদে লোহার তৈরী হাতলে থরে থরে প্যাকেট সাজিয়ে বাজারে শিমের বিচি,বাদাম,মোটর কালাই বিক্রয় করে সংসার চালান তিনি।

বলছিলাম দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার লক্ষিপুর বাজার সংলগ্ন গড়পিংলাই আর্দশ গ্রামের রমজান আলীর ছেলে ইঁদুলের কথা। তিন ভাইয়ের মধ্যে ইদুল সবার ছোট। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বর্তমানে শিঁমের বিচি বিক্রয় করে কনো রকমে চলছে তাদের জীবন। 

সরেজমিনে ইদুলের বাড়িতে গিয়ে দেখাযায়, নোনাধরা ইটদিয়ে ঘেরা বাড়ীর চার পাশে টিনের একচালা একটি মাত্র ঘর টিন দিয়ে ঘেরা। শোবার ঘরের একপাশে রয়েছে একটি গরু আর অন্যপাশে ছেড়া টিনের ঘরে স্ত্রী সন্তান নিয়ে থাকেন তিনি। বৃষ্টি আসলেই মাথাগোঁজার ঠাইটুকুও হয়না। ভাঙা ঘরেই বারান্দায় আপন মনে রশিদিয়ে দোলখাচ্ছে ৩ বছরের শিশুকন্যা জান্নাতুন। পাশেই দুই হাতে স্টেজারে করে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ইঁদুল।

বাড়ীতে ঢোকা মাত্রই প্রতিবেদককে দেখে অনেকটা হতচকিত হয়ে যায় ইদুল মিয়া। কোথায় বসতে দেবেন তিনি। তার বাড়িতে বসার তেমন কিছুই নেই। সেখানেই দাড়ীয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান জীবনের এলোমেলো হাওয়ার ঘটনা। তিনি বলেন,১৩ বছর আগে জমিতে চাষকরা মেশিন দিয়ে চালিত (পাওয়ার টিলার) ট্রলিতে শ্রমিকের কাজ করতেন তিনি। হঠাৎ একদিন তার বাড়ির পাশে লক্ষিপুর বাজারের রাস্তার পাশে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছে ধাক্কা লাগে পাওয়ার টিলার টি। ওই গাড়িতে তিনি চালকের সহযোগীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওই দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই গাড়িটির চালক একই এলাকার নজমুল মেম্বারের ছেলে দুলাল ড্রাইভার মারাযান। এ ঘটনায় ডান পা ভেঙ্গে গুরুত্বর আহত হন তিনি। এতে তিনি বাঁ পায়ে মারাত্মক আঘাত পান। তিনি বলেন,স্থানীয়রা আহত অবস্থায় তাকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানেই প্রায় ২০ দিন চিকিৎসার পর জ্ঞান ফেরে। এরই মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শে তার ডান পায়ের হাঁটু থেকে নিচ পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়। এমন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে ফেলে রেখে চলে যান তার প্রথম স্ত্রী মিলি বেগম। এরপর আর ফিরে আসেনি সে। শুরু হয় তার দুর্ভিসহ জীবন।

কিছিুদিন পর হাসপাতাল থেকে তাকে ছাড় পত্র দেয়া হলে, বাবার টানাপেড়নের সংসারে ফিরে এসে ৪ শতক জায়গায় টিনের ছাপড়ার বাড়ি তৈরী করেন তিনি। পরে পাশের গ্রামের আয়শা বেগমকে বিয়ে করেন তিনি। অভাবের সংসারে ছেলে সাগর (৯) মিম(৫) এবং জান্নাতুন (৩) বছরের শিশু জন্ম গ্রহণ করেন।

সড়ক দূর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে এবং নিজের স্ত্রীকে হারিয়ে অনেকটা বিচলিত হন ইদুল। বাবার অভাবে সংসারের বোঝা হয়ে থাকতে থাকতে অতিষ্ট হয়ে এক সময় অত্মহত্যার পথও বেঁছে নিয়েছিলেন তিনি।পরে ওই গ্রামের এক ব্যক্তির পরামর্শে তিনি স্থানীয় বাজারে বাজারে শিঁমের বিচি, বাদাম,মোটর কালাই বিক্রয় করার সীদ্ধান্ত নেন। পরে সেই ব্যবসা করে স্ত্রী সন্তান নিয়ে কোন মতে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। সকাল হলেই স্ত্রী আয়শা বেগম স্থানীয় একটি চাতালে শ্রমিকের কাজ করতে যান আর ইদুল মিয়া লোহার দুই হাতলেই বাদাম, শিঁমের বিচি সাজিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বাজারে বাজারে ট্রেনে ঘুরে ঘুরে বেচেন সেগুলো।

ইদুল মিয়া বলেন,মাত্র ৩শ টাকা দিয়ে তিনি ব্যবসা শুরু করেছিলেন। এখন তার ব্যবসার পুজিঁ ১৫ শ টাকা। নঁওগা জেলার রাণীনগর ত্রিমহিনী নামের এক বাজার থেকে ১৭০ টাকা কেজি দরে ভাঁজা শিঁমের বিচি ক্রয় করে নিয়ে আসেন। আর বাদাম ৯০ এবং মোটর কালাই কিনেন ৭০ টাকা কেজি দরে। প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮শ টাকার বাদাম বিক্রয় করেন। এতে তার প্রায় দেড় থেকে দুইশত টাকা আয় হয়। এতেই কোন মতে খেয়ে না খেয়ে চলে তার সংসার।

ইদুল বলেন, লোহার হাতলের তৈরী স্টেজারে ভর দিয়ে চলতে হয় তাকে। বহন করার সুবিধার্থে তিনি তার হাতলেই ছিদ্রতে থরে থরে প্লাস্টিকের প্যাকেটে করে সাজিয়ে নেন বিচিগুলো।প্রতিটি প্যাকেটের দাম ১০ টাকা। এই ব্যবসায় তাকে সহায়তা করেন তার ৯ বছরের ছেলে সাগর। সাগর স্থানীয় লক্ষীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩য় শ্রেণির ছাত্র। আভাবের সংসারে বাবাকে সহযোগিতা করতে সেও বাদাম বিক্রি করেন।

জানতে চাইলে স্ত্রী আয়েশা খাতুন কান্না বিজরিত কন্ঠে বলেন,‘অভাবের সংসার দেখে গরীব বাবা তাকে বিয়ে দিয়েছেন। বাবার বাড়ির সহযোগিতায় ১৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু ক্রয় করেছি। জায়গা না থাকায় শোবার ঘরের সাথেই গরুটিকে নিয়ে থাকতে হয়।

তিনি বলেন,‘অনেক সময় কাজ না থাকলে অনাহারে থাকতে হয়। সাগরের বাবা সরকার থেকে একটি প্রতিবন্ধী ভাতা’র কিছু টাকা পাই। কখনো চাতালে আবার কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোন মতেই সংসার চালাতে হয়। সন্তানদের সখ করে ভালো কাপড়ও কিনে দিতে পারিনা। নিজেও অসুস্থ্য।ওষুধ কেনার টাকা না থাকায় চিকিৎসা করাতে পারছিনা। অল্প আয়ে কোন মতে চলে এই সংসার। স্থানীয় ইউপি সদস্যর কাছে চালের কার্ডের কথা বললে তিনি কার্ড দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। 

স্থানীয় খয়েরবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু তাহের মণ্ডল বলেন,ইদুল মিয়া অনেক কষ্ট করে জীবন চালায়। তার লোহার হাতলেই সিম বিচি,বাদাম নিয়ে ফুলবাড়ী,বিরামপুর,লক্ষীপুরসহ বেশ কয়েটি বাজারে বিক্রয় করেন। কষ্ট করলেও তিনি ভিক্ষা করেননা। আমার জানামতে তিনি সরকারি সহায়তা হিসেবে একটি প্রতিবন্ধি ভাতার কার্ডের টাকা পান। আমরাও বিভিন্ন ভাবে তাকে সহযোগিতা করি।

ফুলবাড়ী সচেতন নাগরিক সমাজ (সনাক) এর সদস্য সচিব হামিদুল ইসলাম বলেন,বর্তমান রাস্তাঘাট গুলেতে অশংঙ্খা জনক হারে বাড়ছে যান বাহন। ফলে প্রায় সময় যানযট তৈরী হচ্ছে। তিনি বলেন,বেপরোয়া মোটর সাইকেল চালানো এবং ট্রাকের নিয়ন্ত্রণ নেই। যার কারনে সড়ক দূর্ঘটাগুলো বাড়ছে। রাস্তা চলতে সকলকে সচেতন হতে হবে।

জানতে চাইলে দিনাজপুর নিরাপদ সড়ক চাই জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ বলেন, সড়ক দূর্ঘটনার জন্য নিরাপদ সড়ক চাই থেকে আমরা ১৪৫টি কারণ বের করেছি। এর মধ্যে বেশিগুরুতপূর্ণ মনে হয়েছে। প্রথম কারণ রাস্তার আইন কানুন না মানা, রাস্তাঘাটের অবকাঠামো এবং শিক্ষার অভাব।তিনি বলেন,মানুষকে অনেক সচেতন হয়ে রাস্তায় চলতে হবে। তাহলেই আমরা নিরাপদ থাকব। মানুষ কিভাবে ভালো থাকবে এটাই এখন সময়ের দাবি। 


পুরোনো সংবাদ

হাইলাইটস 7863931363102446319

অনুসরণ করুন

সর্বশেষ সংবাদ

ফেকবুক পেজ

কৃষিকথা

আপনি যা খুঁজছেন

গুগলে খুঁজুন

আর্কাইভ থেকে খুঁজুন

ক্যাটাগরি অনুযায়ী খুঁজুন

অবলোকন চ্যানেল

item