জলঢাকার আসমানী স্যানিমার্ট পরিদর্শন করলেন শিল্পমন্ত্রনালয়ের দুই সিনিয়র সহকারী সচিব


ইনজামাম-উল-হক নির্ণয়,নীলফামারী॥ 
 নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার আরাজি শিমুলবাড়ি গ্রামে গ্রামীন নারীদের আসমানী স্যানিটারী ন্যাপকিন এন্ড স্যানিমার্ট সেন্টার পরিদর্শন করেছেন শিল্প মন্ত্রনালয়ের দুইজন সিনিয়র সহকারী সচিব।

মঙ্গলবার (২ ফেব্রুয়ারী/২০২১) সকাল ১১টার দিকে হঠাৎ করেই শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (পলিসি রিসার্চ এন্ড গ্লোবাল ইস্যুজ ম্যানেজমেন্ট ও ইনোভেশন) মোঃ মোস্তফা জামান ও সিনিয়র সহকারী সচিব (আস) দীপঙ্কর রায় ক্ষুদ্র উদ্যোগতা শিরিন আক্তার আশা’র নিজ হাতে গড়া একটি গ্রামে আসমানী স্যানিটারী ন্যাপকিন এন্ড স্যানিমার্ট সেন্টারে এসে অভিভুত হন। শিরিন আক্তার আশা তার গ্রামে সে কারখানা তৈরী করেছে। বেকার নারীদের একটি কর্মসংস্থান সৃস্টি করার বিষয়টি অতুলনীয়। দুই সিনিয়র সচিব সেন্টারটির পরিদর্শন বহিতে লিখেন শিরিন আক্তার আশা গ্রামের একজন নারী উদ্যোগতা হয়ে নারীদের ঋতুকালিন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায় নেমেছে তা একটি রোল মডেল চেঞ্জ মেকার বটে।

তারা উল্লেখ করেন এরকম একটি কাজ এরকম গ্রাম অঞ্চলে হয়, যা গ্রামীন নারীদের জন্য একটি অর্থনৈতিক কর্মসংস্থা তৈরির স্থান। তারা এই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ সাফল্য কামনা করে।

মুল উদ্যোগতা শিরিন আক্তার আশা জানান, আরাজি শিমুলবাড়ি গ্রামে তার আসমানী স্যানিটারী ন্যাপকিন এন্ড স্যানিমার্ট সেন্টারে কিশোরী উদ্যোক্তা রয়েছে ৩৫ জন। জলঢাকা উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা সহ ১২ জন মার্কেটিং কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এ ছাড়া উৎপাদনে ২০ জন নারী কাজ করছেন।

উল্লেখ যে, সামাজিক আচরণ পরিবর্তনের বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হিসাবে পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের “কালজয়ী” কবিতা আসমানীর নাম ধারন করে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের আরাজী শিমুলবাড়ী গ্রামের কিশোরী ও তরুনী মেয়েরা লেখাপড়ার পাশাপাশি শিশু সুরক্ষায়, শিশু বিয়ে বন্ধ, বয়ঃসন্ধিকালের পরিবর্তন ও ঋতু কালীন স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিষয়ে কাজ করে যাচেছ। পাশাপাশি নিজের হাতে তৈরী করছেন আসমানী নামের স্যানিটারী ন্যাপকিন। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন ওই গ্রামের সাধারন ঘরের একটি মেয়ে সমাজকর্মী নারী উদ্যোক্তা কলেজ পড়ুয়া ছাত্রী শিরিন আক্তার আশা। শিরিন নিজের বাল্য বিয়ে ঠেকিয়ে এখন গ্রামে মানুষজনের কাছে ভিন্নমাত্রার আসমানী হয়ে উঠেছে তার দক্ষ কর্মীবাহিনীকে সাথে নিয়ে। শিরিন এখন নীলফামারীর একটি কলেজে সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে অর্নাসে তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। করোনাকারিন সংকটেও শিরিন আক্তার ও তার দক্ষকর্মী বাহিনী গ্রামে গ্রামে নারীদের ওরিয়েন্টেশন প্রদান করছে। বিশেষ করে শিশু সুরক্ষায় বয়ঃসন্ধিকালের পরিবর্তন ও ঋতুকালীন স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিষয় নিয়ে তারা গ্রামের নারীদের সচেতন করে তুলছে।

শিরিনের ভিন্নমাত্রার আসমানী হওয়ার বাস্তবতার গল্পটি অনেক বড়। শিরিনের বয়স যখন ৯ বছর তখন তার বাল্য বিয়ে ঠিক করেছিল তার বাবা মা। সেই নিজের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের কথা দিয়ে শিরিন জানায় ২০১৪ সালে ৬ অক্টোবর সে গিয়েছিল স্পেনে। সেখানে ৬দিন থেকে ফিরে আসে দেশে। বেসরকারি সংগঠন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের শিশুদলের সদস্য হিসেবে তার স্পেন যাওয়া হয়। আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল, স্পেন আয়োজন করেছিল কংগ্রেসের। তাতে অংশ নেয় শিরিন। কংগ্রেসের প্রথম দিনে বক্তব্য পর্ব শুরু“ই হয়েছিল শিরিনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। তিনটি অধিবেশনে অংশ নেয় সে। পাশাপাশি তৎকালিন স্পেনের সাতজন সাংসদকে ও টেলিভিশনেও বাংলায় নিজের কাহিনী শোনায় শিরিন। অথচ শিরিনের ৯ বছর বয়সে বাবা-মা বিয়ে ঠিক করেছিলেন ফুফাতো ভাইয়ের সঙ্গে। দুই বছরের চেষ্টায় পরিবারের সিদ্ধান্ত বদলে নিজের সেই বিয়ে আটকাতে সম হয় সে। সে সময় বিয়ে করলে স্পেন যেতে পারতোনা শিরিন। শিরিনের বাবা মইনুল ইসলাম দরিদ্র কৃষক। তারা চার বোন ও তিন ভাই। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে।

শিরিন বলেন, নিজের বাল্য বিয়ে ঠেকাতে, সে সময় দুই বছর আমি অনেক কষ্টে ছিলাম। পড়াশোনায়ও মন দিতে পারতাম না। আমার চোখে অনেক স্বপ্ন। তখন বিয়ে হয়ে গেলে সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যেত। কম বয়সে মা হলে শরীর-স্বাস্থ্যও ভালো থাকে না। কথাগুলো বলল সে দৃঢ়কণ্ঠে। যেমন দৃঢ়তায় প্রতিরোধ করেছে নিজের বাল্যবিবাহ, অব্যাহত রেখেছে পড়াশোনা, বাঁচিয়ে রেখেছে এলাকার হত দরিদ্র কিশোরী ও তরুনীদের ভিন্নমাত্রার আসমানী তৈরীতে।

কিশোরী ও তরুরী মেয়েরা এখন দক্ষ কর্মীঃ শিরিনের হাত ধরে জলঢাকা উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের আরাজী গ্রামের কিশোরী ও তরুনী মেয়েরা লেখাপড়ার পাশাপাশি নিজের হাতে তৈরী করছেন আসমানী স্যানিটারী ন্যাপকিন। লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে উপার্জন করে পরিবারের অভাব-অনটন লাঘব করছে। স্পেন সফরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে শিরিন ২০১৬ সালে ১৫ জন কিশোরী মেয়েদের নিয়ে তৈরী করেন একটি দল। তাদের একমাত্র ল হলো দেশের সকল নারীরা যাতে স্বল্প্য মূল্যে স্যানিটারী ন্যাপকিন ব্যবহার করতে পারে। এসব কিশোরী ও তরুনীমেয়েরা ন্যাপকিন তৈরী করেই থেমে থাকেনি। তারা এলাকায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও স্কুলে ঝড়েপড়া রোধে রেখেছেন অগ্রনী ভুমিকা। সমাজকর্মী নারীও উদ্যোক্তা কলেজ পড়ুয়া ছাত্রী শিরিন আক্তার বলেন, আমাদের এলাকায় আমরা আসমানী ন্যাপকিন তৈরী করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রাম-বাজার ও হাসপাতালে বাজারজাত করছি।

আমরা দরিদ্র পরিবারের মেয়ে সংসারে অভাব-অনটন লেখাপড়ার খরচ চালাতে পারেনা বাবা,তাই পরিবারের ও নিজেদের কথা চিন্তা করে এলাকায় ১৫জনের একটি দল তৈরী করি। এ জন্য স্থানীয় বেসরকারী সংস্থা উদয়স্কুর সেবা সংস্থা (ইউএসএস) আমাদের ন্যাপকিন তৈরীর প্রশিক্ষন দেয়। এরপর আমরা নিজের হাতে ন্যাপকিন তৈরীর কাজ শুরু করি। এখন তার দলে সর্বমোট যুক্ত রয়েছে ৩৫ জন। এই দলটি আরও বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে শিরিনের।

একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্বল হলো তার মনের সাহস। কিশোরী ও তরুনীরা নিজের ইচ্ছা আর শক্তি ও মনের সাহসে তারা দক্ষ কর্মী হয়ে উঠেছে। এখন মেয়েরা অভাবকে হার মানিয়ে অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে চলেছে। মেয়েদের হাতের তৈরী ন্যাপকিন ১০ পিস এর দাম ৫০ টাকা। বাজারের বিভিন্ন ন্যাপকিনের চেয়ে অনেক কমদাম। শিরিন হাসি মুখে জানালেন তার আসমানী ন্যাপকিন কারখানা এখন বড় হয়েছে।

শিরিন বলেন, পল্লী কবির সেই আসমানীকে সামনে রেখে আমরা বাল্য বিয়ে যেমন প্রতিহত করছি তেমনি নারীদের ও বয়ঃসন্ধীকালিন স্বাস্থ্য সু-রক্ষায় স্যানিটারী ন্যাপকিন ব্যবহারে আগ্রহ তৈরী করছি। এ জন্য নিজেরাই গ্রামে স্থাপন করেছি ন্যাপকিন কারখানা। সেই আসমানীকে স্মরন করেই ন্যাপকিনের নাম দিয়েছি আসমানী স্যানিটারী ন্যাপকিন।

পুরোনো সংবাদ

হাইলাইটস 1450321966709058679

অনুসরণ করুন

সর্বশেষ সংবাদ

ফেকবুক পেজ

কৃষিকথা

আপনি যা খুঁজছেন

গুগলে খুঁজুন

আর্কাইভ থেকে খুঁজুন

ক্যাটাগরি অনুযায়ী খুঁজুন

অবলোকন চ্যানেল

item