প্রসঙ্গঃ শিক্ষা আইন ও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা

এম এম আলম বাবলু-
সরকার নিজের সাথে নিজেই যুদ্ধ করছেন, নাকি আমলাদের সাথে পেরে উঠছেননা, কোনটি যে সত্যি, তা বলা মুশকিল। ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রনীত হয়েছে। ২০১১ সালে শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে একটি কমিটি গঠন করা হয়। দীর্ঘ ৫ বছর পরে এই কমিটি প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের খসড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দেয়। কিন্তু খসড়াটি দুর্বল হওয়ার কারনে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এ কারনে সেটি ফেরত আনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর ২০১৭ সালে খসড়াটি চুড়ান্ত হলেও অজ্ঞাত কারনে সেটি চাপা পড়ে যায়। দুই বছর পরে, ২০১৯ সালে খসড়াটি আবার পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়। জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে, শিক্ষা আইন প্রনয়নে ইতিমধ্যে ১০ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এখন বলা হচ্ছে নোট গাইড অবৈধ থাকবে, কোচিং বন্ধ হবে, তবে শর্ত সাপেক্ষে ব্যবসায়িক কোচিং, টিউশন চলবে।
শিক্ষা আইন প্রনয়নে নিশ্চয় টার্মস এ্যান্ড কন্ডিশন ছিল। আমার পুরো বিষয়টি জানা নেই। তবে, এটুকু বুঝি গঠিত কমিটি চুলচেরা আলোচনা, পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষন শেষে একটি নির্ভুল, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা প্রসূত খসড়া চুড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিবেন , এমনটি প্রত্যাশা করা হয়েছিল। তবে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দিপু মনির ওপর আমরা আস্থা রাখতে পারি। তিনি অত্যান্ত সজ্জন ও কাজের মানুষ। শিক্ষা আইন প্রনয়নে কেন বিলম্ব হয়েছে সেটি খুঁজে বের করতে তিনি সচেষ্ট হবেন। ইতিপূর্বে যে কমিটি গঠন করা হয়েছিলো, তাদের সাথেও কথা বলবেন। “ডালমে কুচ কালা হ্যায়” রয়েছে কি না সেটিও দেখবেন আশা করি।
গাইড নোটের বিষয়টি  ১৯৮০ সালে ফয়সালা হয়ে গেছে। ওই বছর  গাইড নোট বই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর পরই পুস্তক প্রকাশনীগুলো নড়েচড়ে বসে। তারা সারাদেশে পুস্তক বিক্রেতাদের নিয়ে একটি সংগঠন দাঁড় করায়। “বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি” এই ব্যানারে সৃজনশীল ও অনুশীলন সহায়ক বই প্রকাশ করে আসছেন। তাদের সহায়ক বইগুলো জেলা উপজেলায় এজেন্ট নিয়োগ করে এবং স্কুল মাদরাসায় নির্বিঘ্নে চালাতে প্রতিনিধির মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা ডোনেশনের নামে ঘুষ দিয়ে চালিয়ে আসছেন।
প্রকাশনীগুলোর বক্তব্য হচ্ছে, শিক্ষকদের বড় অংশটি সৃজনশীল ও অনুশীলন পদ্ধতি বোঝেন না। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে তারা গাইড বই প্রকাশ করেন। এব্যাপারে, অভিভাবকদের বক্তব্য হচ্ছে, যথেষ্ট সময় ও মনযোগ দিয়ে পাঠদান করলে শিক্ষার্থীদের সহায়ক বইয়ের দরকার হয়না । শিক্ষকদের বড় অংশ সৃজনশীল ও অনুশীলন পদ্ধতি বোঝেন না, প্রকাশকদের এই দাবী ও অভিযোগের বিষয়ে তারা বলেন, প্রতিবছর এসব শিক্ষকদের জন্য প্রকাশকেরা “শিক্ষক গাইড” প্রকাশ করতে পারেন।
প্রকাশকদের আরেকটি বক্তব্য হচ্ছে, শিক্ষার্থী এবং তাদের মা বাবা নিজেদের ইচ্ছায়, পছন্দের কোন গাইড বই সংগ্রহ করতে পারেন না। ভালোমন্দ যাচাই করার সুযোগ থাকেনা তাদের। প্রকাশকদের সাথে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অথবা ম্যানেজিং কমিটির মধ্যে চুক্তি মোতাবেক নির্দিষ্ট ‘একের ভিতর সব’, একের ভিতর অনেক, এবং একের ভিতর এগারো” এ জাতীয় নামের নির্দিষ্ট গাইড বা সহায়ক বই নিতে হয়। বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় ওই নির্দিষ্ট সহায়ক বই থেকে প্রশ্ন করা হয়। এ কারণে অন্যকোন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত গাইড বই যেসব শিক্ষার্থী সংগ্রহ করেন তাদেরকে বিপাকে পরতে হয়।
এবার আসা যাক, গ্রামার ও ব্যাকরণের কথায়। সারাদেশের স্কুল ও মাদরাসায় এনসিটিবি প্রকাশিত সমস্ত পাঠ্যপুস্তক সরকার ২০১১ সাল থেকে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের  মাঝে বিতরণ করে আসছে। বছরের প্রথম দিন পাঠ্যপুস্তক হাতে পেয়ে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে অনাবিল আনন্দ দেখা যায়। কিন্তু পাঠ্যপুস্তক বিতরণের সপ্তাহ যেতে না যেতেই সেই আনন্দে ভাটা পড়ে। বিদ্যালয় বা মাদরাসা কর্তৃপক্ষ প্রত্যেক শিক্ষার্থীর হাতে একটি করে লিষ্ট ধরিয়ে দিয়ে বলেন,  এই গ্রামার ও ব্যাকরণ বই কিনতে হবে তোমাদের।  অভিযোগ রয়েছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে এনসিটিবি যেসকল পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ করে থাকে তার মধ্যে ইংরেজী গ্রামার ও বাংলা ব্যাকরণ বই থাকা সত্বেও সেগুলো শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হয় না। পড়ানো হয় নানান প্রকাশনীর ইংরেজী গ্রামার ও বাংলা ব্যাকরণ বই। এর জন্য লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে থাকে প্রকাশনীগুলো। ২০১১ সাল থেকেই প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেন করছে তথাকথিত প্রকাশনীগুলো। তাদের ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা জানে, জানতে পারে। ঘুষের বিষয়টি এসব শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কে গ্রথিত-প্রথিত হয়ে যায়। যে কারণে শিক্ষকদের প্রতিও তাদের শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি দেখা যায় অনেক সময়।
শিক্ষা আইনের খসড়ায় শিক্ষকদের সব ধরনের কোচিং, টিউশন নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। আর শর্ত সাপেক্ষে ব্যবসায়িক কোচিংকে বৈধতা প্রদান করা হয়েছে। বিষয়টি “বজ্র আটুনি আর ফস্কা গেরো” এই প্রবাদের সাথে তুলনা করছেন অনেকে। যে সকল শিক্ষক বর্তমানে কোচিং পরিচালনা করছেন, কোচিংয়ে শিক্ষকতা করছেন, আইনটি পাশ হলে তারা কোচিং সেন্টারের নাম ও মালিকানা পরিবর্তন করে অনৈতিক ব্যবসাটি অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবেন। আর শর্ত সাপেক্ষে ব্যবসায়িক কোচিং সেন্টার চালাতে দিলে প্রকারন্তরে ব্যয়বহুল বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা পেয়ে যাবে।
সরকার প্রাক প্রাথমিকের শিক্ষার্থী হতে শুরু করে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করে আসছে। দেশের যত প্রকার কিন্ডারগার্টেন আছে সে সবের শিক্ষার্থীদেরও সরকার এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে দিয়ে থাকে। তা সত্বেও ইংরেজী ভার্সন ও আরবি ভার্সনসহ সব কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীদের  ৬/৭টি করে বাড়তি বই নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় । এসব পুস্তক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান অথবা বিদ্যালয় থেকে সংগ্রহ করতে হয়।
সরকার বলছে, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত বই চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। তাছাড়া অভিন্ন মেধা বিকাশের কথাও বলছেন সরকার। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কে আর শোনে সরকারের কথা। সারাদেশে ইংরেজী ভার্সন, আরবি ভার্সনসহ নানা ধরনের কিন্ডারগার্টেনের ছড়াছড়ি। বাঙ্গালিরা বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘ লড়াই, সংগ্রাম ও রক্তদান করেছে। একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে প্রিয় বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে। কিন্তু এখন অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে,  ইংরেজী আর আরবি ভাষার জন্য আমরা সবকিছু করতে রাজি আছি।
সরকার প্রথমিকের সব বই বিনামূল্যে দিয়ে থাকে শিক্ষার্থীদের। আগেই বলা হয়েছে এ কথাটি। সরকারের দেয়া বইয়ের মধ্যে ইংরেজী গ্রামার ও বাংলা ব্যাকরণ আলাদাভাবে থাকেনা। কিন্তু কিন্ডাগার্টেনের শিক্ষার্থীদের ইংরেজী গ্রামার ও বাংলা ব্যাকরণ, সাধারণ জ্ঞানসহ আরও কিছু বই বাড়তি হিসেবে সংগ্রহ করে পাঠ গ্রহণ করতে হয়। আমরা দেখতে পাচ্ছি এভাবে শৈষবেই বাঙ্গালি জাতির মধ্যে ভিভাজনের বীজ রোপন করার কাজটি চলে আসছে।
ব্যবসায়িক কোচিংকে বৈধতা দান ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলের বৈধতাদানকে একই সুতায় গাঁথা বলে মনে করছেন অভিভাবকেরা।
পুস্তক বিক্রেতারা বলছেন, প্রকাশকরা এখন সহায়ক বইয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন। নোট গাইড যাতে বৈধ থাকে, সারাদেশের শিক্ষকরা যেন সারা জীবন নোট গাইডের ওপর নির্ভরশীল থাকেন এবং শিক্ষার্থীরা যেন প্রজন্ম পরম্পরায় নোট গাইড কিনতে বাধ্য থাকেন তার পাকাপোক্ত ব্যবস্থার জন্য চেষ্টা তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।
এর আগে বছরের শুরুতে পাঠ্যপুস্তক নিয়ে যখন চরম দূর্নীতি হয়েছে, পুস্তক প্রকাশক ও সমিতির কর্মকর্তারা নীরব-নিশ্চুপ থেকেছেন। ১৯৯৬ সালে ৬ষ্ঠ শ্রেণি হতে ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত সব পাঠ্যপুস্তক ৪/৫ গুণ বেশি দামে  বিক্রি হয়েছে। বোর্ড বইয়ের সাথে সমপরিমাণ গাইডবই নিতে বাধ্য করা হয়েছে। তখন এসবের বিরুদ্ধে কাউকে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি । দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দূর্নীতি বন্ধ করার লক্ষে সরকার সমস্ত বই বিনামূল্যে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তখন কোথায় ছিলেন পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির কর্মকর্তারা?  তখন একজন মানুষকেও বলতে শোনা যায়নি, লাখ লাখ মানুষের রুটি রুজি এর সাথে জড়িয়ে আছে। বলতে শোনা যায়নি অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। আর এখন দুর্নীতি যায়েজ আর অব্যহত রাখার জন্য দৌড়ঝাপ শুরু হয়েছে। সমিতিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে, পুস্তক বিক্রেতারা ইতিমধ্যে জেনে গেছেন এ সমিতি তাদের নয়। শুধু প্রকাশকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য গঠন করা হয়েছে এ সমিতি। তাদের স্বার্থে শিক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে কি না সেটি দেখার জন্য শিক্ষামন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও পুস্তক সারাদেশের বিক্রেতারা।

পুরোনো সংবাদ

শিক্ষা-শিক্ষাঙ্গন 379728887895211900

অনুসরণ করুন

সর্বশেষ সংবাদ

কৃষিকথা

ফেসবুক লাইকপেজ

আপনি যা খুঁজছেন

গুগলে খুঁজুন

আর্কাইভ থেকে খুঁজুন

ক্যাটাগরি অনুযায়ী খুঁজুন

অবলোকন চ্যানেল

item