গুণী শিল্পীদের সান্নিধ্যে কাঁচা হাতে ছবিআঁকতে ব্যস্ত ক্ষুদে শিল্পীরা॥ জমজমাট আন্তর্জাতিক চারুকলা উৎসব


ইনজামাম-উল-হক নির্ণয়, বিন্ন্যাদিঘি থেকে॥ প্রকৃতিতে মিশে আনন্দময় হৈ-হুল্লোড় মধ্য দিয়ে গুণিজনদের সান্নিধ্যে ক্ষুদে,তরুণ শিল্পীরা কাঁচা হাতে ছবি এঁকে পার করলো দিনটি। বলতে গেলে জমজমাট আয়োজনে ক্ষুদে,তরুণ ও দেশ-বিদেশের গুণি শিল্পীদের এক মিলন মেলা এই উৎসবটি। রং-তুলি দিয়ে ছবি আঁকা কাগজে তারা প্রকৃতিকে চমৎকারভাবে ধারণ করছে, যেনো মনে হচ্ছে প্রকৃতিই তাদের জীবন। কেউবা গ্রামীণ দৃশ্য, কেউবা ফুল ও ফুলের বাগান, পশু, পাখি, গাছ, গরুর গাড়ি, গ্রামীণ ঘরবাড়ি নানা দৃশ্য, আবার কেউবা একটি শিশুর ছবি আঁকছে। রঙ্গের ছোঁয়ায় তাদের আঁকা ছবিগুলি দেখলেই মন আনন্দে ভরে উঠছে। ক্ষুদে শিল্পীরা নয় তাদের আঁকা ছবিগুলি কথা বলছে। ছবি ভাষায় বৈষম্য, অন্যায়, অবিচারে বিরুদ্ধে প্রতিবাদী তারা। রৌদ্দকে ফাকি দিয়ে গাছতলা নিচে বসে কাঁচা হাতের রঙের ছোয়ায় ছবি এঁকে এমনি মনের ভাব প্রকাশ করেছে তারা। 
আজ শুক্রবার(২৮ ফেব্রুয়ারি/২০২০) নীলফামারীর নীলসাগর বিন্ন্যাদিঘিতে আন্তর্জার্তিক চারুকলা উৎসব/২০২০ এর তৃতীয় দিন। অফিস-আদালত-প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে দলে দলে সাধারণ মানুষজন অংশ নিচ্ছেন এই উৎসবে। ঘুরে ঘুরে দেখতে ক্ষুদে শিল্পীদের আঁকা ছবি। উৎসবে ছিল জারি, সারি, পালা গান, বাউল গান, লোকো গান, বীর গীত, পুথি পাঠ, হরি কীর্তনের আসরও। ছিল বানদী, হাড়ি ভাঙ্গা, লাঠি খেলাও। 
শিল্পকলা চর্চার মাধ্যমে মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন ভবিষ্যৎ প্রজম্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে ক্ষুদে, তরুণ আর গুণি শিল্পীদের এই মিলন মেলার আয়োজন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া চার দিনেন উৎসবটির অতিবাহিত হয়েছে তৃতীয় দিন। আগামীকাল শনিবার(২৯ ফেব্রুয়ারি/২০২০) সমাপণী অনুষ্ঠানের অংশে বিন্ন্যাদিঘি চত্ত্বরে প্রদর্শণী অনুষ্ঠিত হবে শিশু এবং গুণী শিল্পীদের আঁকা ছবিগুলি। দিন শেষে সন্ধ্যা ছয়টায় বিদায়ের সুর বেজে উঠবে এই মিলন মেলাটির। গতকাল বৃহস্পতিবার(২৭ ফেব্রুয়ারি/২০২০) ঘন্টা বাজিয়ে এই উৎসবের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। 
চারুকলা উৎসবে অংশ নিয়ে আনন্দিত বিদেশী শিল্পীরা। তাদের মধ্যে ভারত কলকাতা থেকে এসেছেন শিল্পী পামেলা দাসগুপ্ত। অনুভুতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, এখানে এসে প্রকৃতির সাথে মিশে ছবি আঁকছি। সাথে তিনশতাধিক শিশুদের অংশগ্রহনে উৎসবের আমেজ ফুটিয়ে উঠেছে। নিজে ছবি আঁকছি, তাদের ছবি আঁকা দেখছি এক অন্য রকম অনুভুতি। যা অন্য কোথাও ঘটেনি। একই ধরণের অনুভুতি প্রকাশ করেন যুক্তরাষ্ট্রের খুরশীদ আলম সেলিম, নেপালের কোশাল কুমার হামাল, মায়ানমারের মনথ্যাট তিও সহ অনেকে। 
ঘুরতে ঘুরতে দেখা মিললো শিশুদের জনপ্রিয় ছোট কাকু নাটকের ছোট কাকু আফজাল হোসেনের। তিনিও ক্ষুদে শিল্পীদের সাথে ছবি আঁকছেন। তিনি বলেন, রাজধানীর বাহিরেও এতো সুন্দর পরিবেশে এই উৎসবে অংশ নিতে পেরে আমি খুশি। তাদের সাথে কথা বলছি, ছবি আঁকছি এতেই বুঝা যায় শিল্প চর্চায় শিশুরা কত আগ্রহী। 
প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ইরাম মাহমুদ দুতি বলেন, এমন একটি বড় আয়োজনে অংশ নিতে পেরে আমি আনন্দিত। আমি চাই এই উৎসবে প্রতি বছর যেনো হয়। একই অনুভুতি প্রকাশ করে শিশু শিল্পী তমালিকা রায়, নূরে রাহেনা আক্তার, মীর উর্ষিতা, ইফসাত জেরিন অপ্সরা, রুম্মান রহমান, সাদিক আনোয়ারসহ অনেকে। 

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া উৎসবটি গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে অংশগ্রহণ করেন উৎসব আয়োজনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক নীলফামারী সদর আসনের সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কে,এম খালিদ, বরেণ্য শিল্পী অধ্যাপক রফিকুন নবী এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের লিটু।
এসময় অতিথিরা অভিভাবকদের কাছে আহ্বান জানিয়ে বলেন শিশুদের বাধা না দিয়ে এ কাজে উৎসাহ দেওয়ার জন্য। ঢাকা এবং চট্টগ্রাম শিল্প চর্চায় যেভাবে এগিয়ে আছে এই উৎসবের মধ্যদিয়ে উত্তরবঙ্গও এগিয়ে যাবে বলে তারা বিশ্বাস। আসাদুজ্জামান নূরের নেতৃত্বে ৩০ হাজার খুদে কবি এ জেলায় রয়েছে। চেষ্টা করলে ৫০ হাজার চিত্র শিল্পও এ জেলায় তৈরি হবে। 
জানা যায়, প্রথম দিন সকাল ১০টা থেকে নীলসাগর চত্বরে জমায়েত হতে থাকেন ক্ষুদে ও তরুণ শিল্পীরা। সেদিন বেলা ১১টায় গোটা নীলসাগর চত্ত্বর পরিণত হয় শিল্পীর মিলন মেলায়। উৎসব সফল করতে বিভিন্ন শিল্পককর্ম দিয়ে তারা সাজিয়ে তোলে উৎসব¯'ল। দ্বিতীয় দিনে যে যার মত করে ছবি এঁকে বিকালে যোগ দেয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে।
সুত্র মতে, চারুকলা উৎসবটির আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস এবং কিউরেটর সহকারী অধ্যাপক হারুন অর রশিদ টুটুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গুণি শিল্পী, চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী এবং সাংস্কৃতিমনা কিছু ব্যক্তির সমন্বয়ে বাস্তবায়ন হচ্ছে উৎসবটি। সেটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে ¯'ানীয় সংগঠন ভিশন-২০২১ এবং ঢাকার আর্ট বাংলা। 

আয়োজক কমিটির কিউরেটর ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হারুন অর রশিদ টুটুল জানান, শিল্পকলা চর্চার মাধ্যমে রুচিশীল ও সংস্কৃতিমনস্ক প্রজম্ম গড়ে তোলা এবং কয়েক প্রজম্মের শিল্পীদের মধ্যে পারস্পরিক মেলবন্ধন সৃষ্টির উদ্দেশ্য উৎসবের আয়োজন। বাংলাদেশের বরেণ্য ও তরুণ শিল্পীবৃন্দ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপাইন, রুমানিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, জার্মানী ও ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ১২ জন স্বনামধন্য শিল্পী অংশগ্রহন করেছেন। তাদের সান্নিধ্যে নীলফামারী জেলা ২০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ২০০ শিক্ষার্থী টানা চার দিন শিল্পকর্ম নির্মানের সুযোগ পাবে। ওই উৎসবে রয়েছে আন্তর্জাতিক আর্টক্যাম্প, কনটেম্পোররি আর্ট প্রজেক্ট, শিল্পকর্ম প্রদর্শনী, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কারুশিল্প মেলা ও লোক সংস্কৃতির বৈচিত্রময় উপ¯'াপন। এর আগে জয়পুরহাট এবং গাজিপুরে ওই উৎসব অনুষ্ঠিত হলেও এবারই প্রথম আন্তর্জাতিক পরিসরে আয়োজন করা হয়েছে। 
তিনি আরো জানান, কারু শিল্প প্রদর্শিত হচ্ছে ২০ স্টলে। উৎসবে অংশগ্রহন করেছেন ১৬০ জন শিল্পী। এর মধ্যে ১০০ জন তরুণ। উৎসবে আঁকা চিত্রকর্মগুলো নিয়ে নীলসাগরে প্রদর্শণী অনুষ্ঠিত হবে ২৯ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা থেকে। এরপর ২৫ থেকে ৩০ এপ্রিল দ্বিতীয় প্রদর্শণী অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে। 

উৎসবের আহ্বায়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, শিল্পচর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম ইতিবাচক কাজের দিকে ধাবিত হবে এটিই আমাদের উদ্দেশ্য। উৎসবের লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের শিল্পী বানানো নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্ম যেন শিল্পমনার মাধ্যমে মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন হয়। 

সেচ্চাসেবী সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী ও উৎসব আয়োজন কমিটির সদস্য সচিব ওয়াদুদ রহমান জানান, উৎসবটি বাস্তবায়নে সংগঠনের ১৫০ সেচ্ছাসেবী কাজ করছেন। # 

পুরোনো সংবাদ

শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি 221364374147970368

অনুসরণ করুন

সর্বশেষ সংবাদ

কৃষিকথা

ফেসবুক লাইকপেজ

আপনি যা খুঁজছেন

গুগলে খুঁজুন

আর্কাইভ থেকে খুঁজুন

ক্যাটাগরি অনুযায়ী খুঁজুন

অবলোকন চ্যানেল

item