সবজি ও বীজ উৎপাদনে নীলফামারীতে নেট হাউজ

ইনজামাম-উল-হক নির্ণয়, নীলফামারী॥
প্রতিটি চাষির বাড়িতে পরিকল্পিত সবজি বাগান তৈরি করে পুষ্টি ও আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব। এখনও বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনাতে নানা রকম শাকসবজি আবাদ করা হচ্ছে বটে, তবে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ততটা পরিকল্পিত নয়। তবে পরিকল্পিত সবজি চাষ ও বীজ উৎপাদনে সফলতা এনেছে উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী সদরের খোকশাবাড়ি ইউনিয়নের শাহপাড়া গ্রামের সবজি চাষিরা।
কখন কোন সবজির চাষ করলে জমিতে বছরে সবচেয়ে বেশিবার চাষ করা যাবে, কীভাবে চাষ করলে সবজি ফসলে কম পরিমাণ সার-বা কিটনাশক লাগবে। ফসল হবে বিষমুক্ত।
এখানকার সবজি চাষীরা পোকামাকড় ও পশু-পাখির অত্যাচার থেকে যে কোনো ধরনের ফসল রক্ষায় বিষ ব্যবহারের বিপক্ষে।  বেগুন পোকার হাত থেকে রক্ষা করতে জমি নেট দিয়ে ঘিরে রাখে। বেগুন, মিষ্টিকুমড়াসহ সবজি ক্ষেতের পোকামাকড় দমনে ফেরোমন ফাঁদ, ব্যাগিং পদ্ধতি ও নেট ব্যবহারের পক্ষে। এভাবে বেগুন, মিষ্টিকুমড়া চাষে একদিকে বিষ কম লাগে। অন্যদিকে পোকা-মাকড় ও পশু-পাখির অত্যাচার কম হয়। আবার বাজারে বেগুন ও মিষ্টি কুমড়াসহ বিষমুক্ত সবজির চাহিদা বেশি। এ ছাড়া ধান চাষে প্যার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করে এলাকার কৃষকরা।
এই সকল ফরমুলা কাজে লাগিয়ে সবজি ও ধান চাষে বাজিমাত করে চলেছেন ওই গ্রামের চাষিরা। তারা পুষ্টি নিরাপত্তা ও দারিদ্র দূরীকরণে সফলতাও দেখিয়ে দিয়েছেন। এই সফলতা ধরে রাখতে চলছে তাদের সংগ্রাম।
এই সংগ্রামে তারা দুর করেছে অভাব বা মঙ্গা। অর্জিত আয়ে ওই গ্রামের অনেকেই কিনছেন জমি। খড়ের ছাউনি বদলিয়ে নির্মাণ করেছেন আধাপাক টিনের ঘর। লেখাপড়া শেখাচ্ছেন সন্তানদের।
নীলফামারী জেলা শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে গ্রামটির অবস্থান। আজ শুক্রবার(১১ অক্টোবর) সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায় সে গ্রামের কৃষি জমিতে বিভিন্ন সবজি ও সবজির বীজ উৎপাদনে স্থাপিত সারি সারি নেট হাউজ চোখে পড়ে। মানসম্মত সবজি বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে এসব নেট হাউজে। এলাকার কৃষকরা জানান, ওই নেট হাউজে আবাদ করা হয় বেগুণ বীজ। সঠিক মানের বীজ উৎপাদনের জন্য ওই হাউজের ব্যবস্থা। সাধারণ কৃষির চেয়ে খরচ বেশি বীজ উৎপাদনে, আয়ও কয়েকগুণ বেশি। এখানকার বহু কৃষক সবজি বীজ যেমন উৎপাদন করছেন তেমনি সবজি চাষ করে বাজারজাত করছেন। বাজারে উঠেছে তাদের উৎপাদিত দেশী বেগুন,করলা,ফুলকপি,পাতাকপি,মুলা প্রভৃতি।প্রায় দশ বিঘা জমিতে উৎপাদন হচ্ছে এসব সবজি।
গ্রামের সবজি চাষি জামান, আলি হোসেন, আফজাল, বক্কর, বশির,হামিদ সহ আরো অনেকে জানায় সবজি চাষে তারা বিষমুক্ত সবজি বাজারজাত করনে বদ্ধপরিকর। তাই বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করছেন তারা। তাদের  মেনেই  নিয়ে তাদের বাজার যেতে হয়না। প্রতিদিন সকাল হলেই পাইকাররা এসে সেই সবজি ক্রয় করে নিয়ে যায়। বিষমুক্ত সবজি দাম একটু বেশী হলেও বাজারে এর চাহিদা প্রচুর বলে জানান তারা। সবজি উৎপাদনে ভাগ্যবদল হয়েছে তাদের হাসিমুখেই সকলে আনন্দ উচ্ছাসেই তা প্রকাশ করলেন।
অপরদিকে এই গ্রামে উৎপাদন করা হচ্ছে সবজি বীজ। গ্রামের কৃষক মো. মোমিনুর রহমান জানান (৩৮), বীজ ক্রয়ের নিশ্চয়তা দিয়েছেন লাল তীর ক¤পানী। সঠিক মানের বীজ উৎপাদনের জন্য কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছে কো¤পানীর লোকজন। বিভিন্ন জাতের বীজের আগাম মূল্য নির্ধারণ করে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন তিনি। ওই কৃষকের কৃষি জমি সাড়ে তিন বিঘা। এর মধ্যে ধানের আবাদ করেন মাত্র ২২ শতক জমিতে। অবশিষ্ট জমি ব্যবহার করছেন বীজ উৎপদনের কাজে। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায় আগে রাজমিস্ত্রির পেশায় ছিলেন তিনি। সে সময়ে অভাব অনটন লেগে থাকতো তার। ২০০৯ সালে এলাকায় তিনি সবজি ও সবজির বীজ উৎপাদনে নেমে পড়েন। শুরুতেই করলা বীজ উৎপাদন করে লাভবান হয়েছিলেন । তিনি বলেন, এখন আর অভাবে পড়তে হয়না, না খেয়েও থাকতে হয়না। মোমিনুর গত বছর ৩৫ শতক জমিতে করলা বীজ উৎপাদন করে ৪২ কেজি বীজ বিক্রি করে পেয়েছেন ৯২ হাজার ৪০০ টাকা। বীজ উৎপাদনে তার খরচ হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। প্রতি কেজি বীজ দুই হাজার ২০০ টাকা করে বিক্রি করেছেন তিনি। পাশাপাশি ওই বছর ২০ শতক জমিতে মিষ্টি কুমড়ার বীজ উৎপাদন করে পেয়েছেন ৩২ হাজার টাকা। এ জন্য খরচ হয়েছিল পাঁচ হাজার টাকা। এ কাজে যুক্ত থেকে গত নয় বছরে সংসারে এসেছেন স্বচ্ছলতা। খড়ের ছাউনি ফেলে নির্মাণ করেছেন টিনের ঘর। ৮০ হাজার টাকায় কিনেছেন সাত শতক জমি। সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করেছেন বড় মেয়ের বিয়েতে। অপর এক ছেলে এক মেয়েকে পড়াচ্ছেন স্কুলে।
এবারে বেগুন বীজ উৎপাদনের কাজে নেমেছেন ১৮ শতক জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরেছেন ৩৫ কেজি বীজ। এজন্য খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। নেট হাউজ তৈরীতেই তার খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকা। প্রথমবারের ন্যায় ওই নেট হাউজ তৈরী করায় খরচ একটু বেশি। তবে ওই নেট হাউজের আয়ু অন্তত ১০ বছর। পরবর্তীতে বীজ উৎপাদনে কমে যাবে সে খরচ। প্রতি কেজি বীজ বিক্রির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন তিন হাজার টাকা দরে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে এবারে উৎপাদিত বেগুন বীজ থেকে পাবেন এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা।
একইভাবে গ্রামের কৃষক হাফিজুল ইসলাম (৩৪) সাড়ে সাত শতক জমিতে বেগুন, পাঁচ শতকে টমেটো, এক বিঘায় করলা, ৪০ শতক জমিতে কুমড়া বীজ উৎপাদন করছেন। ২০০৮ সাল থেকে বীজ উৎপাদনের কাজে নিজেকে জড়িয়ে কিনেছেন জমি, বদলিছেন বাড়ির চেহারা, লেখাপড়া শেখাচ্ছেন ছেলে মেয়েদের।হাফিজুল ইসলাম জানান, লাভ দেখে এলাকার কৃষকরা বীজ উৎপাদনের কাজে ঝুঁকে পড়ছেন। বর্তমানে গ্রামে বীজ উৎপাদনে কৃষকের সংখ্যা অর্ধশতাধিক।বীজ উৎপাদন ও বিপণন কো¤পানী লাল তীরের নীলফামারী জেলা ব্যবস্থাপক নাসিরুল হক বলেন, ২০০৭ সাল থেকে এ জেলায় কৃষকদের মাধ্যমে বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে। উচ্চ ফলনশীল বেগুন, মরিচ ও টমেটো বীজ নেট হাউজ পদ্ধতিতে করতে হয়। করলা, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, চিচিংগা, ঢেরস প্যাকেটের মাধ্যমে করা হয়। গোটা জেলায় চুক্তিবদ্ধ কৃষকের সংখ্যা ২৫০ জন। এর মধ্যে খোকশাবাড়ি ইউনিয়নে রয়েছেন ৫০ জন। সবজি বীজ চাষ করে ধানের চেয়ে ১০ গুণ বেশি লাভ করছেন কৃষক।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, এলাকাটি আমরা প্রতিনিয়ত নজরে রেখেছি। কৃষকদের সবসময় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তিনি জানান সবজি বীজ উৎপাদন উম্মুক্ত থাকায় কৃষি বিভাগের কোনো প্রত্যয়নের প্রয়োজন হয় না। ব্যবসায়ীক কারণে কো¤পণীগুলো তাদের বীজের গুণগত মান ধরে রাখেন। বীজের কো¤পাণী গুলোর তৎপরতায় কৃষকরা বীজ উৎপাদনে প্রশিক্ষিত হয়ে উঠছেন, ভবিষ্যতে সরকার কৃষকদের সহযোগিতা দিলে এ অঞ্চলে বীজ উৎপাদন একটি শিল্প হিসেবে গড়ে উঠবে। #

পুরোনো সংবাদ

নীলফামারী সদর 4716124460709671980

অনুসরণ করুন

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

শিল্প-সাহিত্য

ফেসবুক লাইকপেজ

তারিখ অনুযায়ী খুঁজুন

অবলোকন চ্যানেল

item