নীলফামারীতে দশম শ্রেনীর ছাত্রীর আত্মহত্যা॥ শিক্ষককে দায়ী করে সহপাঠিদের বিক্ষোভ মিছিল সড়ক অবরোধ

বিশেষ প্রতিনিধি ৫ নবেম্বর॥
সুরভী রায় ওরফে বৃষ্টি (১৫) নামের এক স্কুল ছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। সে নীলফামারী সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী। সে ২০১৮ সালের মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় অংশগ্রহনের পূর্বশর্ত বিদ্যালয়ের টেস্ট পরীক্ষায় দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় আত্মহত্যা করে বলে প্রচার পেয়েছে।

এ ঘটনায় তার সহপাঠীরা স্কুলের ভুগোল বিষয়ের শিক্ষককে আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী হিসাবে দায়ি করে আজ রবিবার (৫ নবেম্বর) বিকাল সাড়ে তিনটায় শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। মিছিল শেষে ছাত্রীরা জেলা শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে দুই ঘন্টা সড়ক অবরোধের পর সন্ধ্যায় ৬টায় অবোরধ কর্মসুচি তুলে নিয়ে এবং  আগামীকাল সোমবার (৬ নবেম্বর) সকালে জেলা প্রশাসক কার্যালয় ঘেরাও, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচির ঘোষনা করে।

আত্মহত্যার শিকার সুরভী রানী নীলফামারী জেলার সদর উপজেলার কুন্দুপুকুর ইউনিয়নের পূর্ব পাটকামুড়ি দেবীর ডাঙ্গা এলাকার ভীষ্ম রায়ের মেয়ে। সে নীলফামারী সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের দশম শ্রেনীর “ক” শাখার ছাত্রী। তার রোল নম্বর ২৮।
ছাত্রীদের অভিযোগে জানা যায়, সুরভী রায় ওরফে বৃষ্টি জেলা শহরের পৌর এলাকার তিন নম্বর ওয়ার্ডের মিলনপল্ল¬ীতে তার নানা খোকারাম রায়ের বাড়িতে থেকে লিখাপড়া করতো। ২০১৮ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহনের লক্ষ্যে ওই বিদ্যালয় দশম শ্রেনীর ২১৬ জন ছাত্রীর টেস্ট পরীক্ষা নেয়া হয়। পরীক্ষা চলে ১১ অক্টোবর হতে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত। টেস্ট পরীক্ষার ফলাফলের আগে খাতা দেখানো হয় ১ ও ২ নবেম্বর। সুরভি অন্যান্য বিষয়ে ৭০ মার্ক করে পেলেও সে ইতিহাস ও ভুগোল বিষয়ে ফেল করে।

২ নবেম্বর ইতিহাস বিষয়ের খাতা দেখান সহকারী শিক্ষিকা নুরন্নাহার বেগম ও ভুগোল বিষয়ের খাতা দেখান সহকারী শিক্ষক মোকছুমুল হাকিম চৌধুরী লেলিন। ইতিহাসে সুরভী ৫ ও ভুগোলে ২ নম্বর পায়। কিন্তু ভুগোলের শিক্ষক মোকছুমুল হাকিম চৌধুরী লেলিন সকল ছাত্রীদের সামনে সুরভীকে গালমন্দ করে স্কুলের সকল ছাত্রীদের কাছে তার ভুগোলের খাতা দেখিয়ে দেখিয়ে বেড়াতে থাকে। সুরভী এ সময় লেলিন স্যারের হাত ও পায়ে পড়ে ক্ষমা চেয়ে খাতাটি অন্যান্য ছাত্রীদের না দেখার জন্য অনুরোধ করছিল। কিন্তু ওই শিক্ষক সুরভীর কোন কথা না শুনে তাকে উল্টো ভৎসা করতে থাকে। ভুগোলে প্রাইভেট না পড়ায় সে ফেল করেছে এমন কথাও শিক্ষক বলতে থাকে। যা সুরভীকে মানষিকভাবে চরম আঘাত করে।

এ অবস্থায় গতকাল শনিবার (৪ নবেম্বর) রাতে বাড়ির নিজ ঘরে গলায় ফাঁস দিয়ে সুরভী আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার আগে সুরভী তার পরিবারের উদ্যেশে একটি চিরকুট লিখে যায়। সেখানে লিখা ছিল
“তোমাদের স্বপ্ন পূরন করতে পারলাম না, টেস্ট পরীক্ষায় আমাকে ফেল করে দেয়ার কারনে আমি বিদায় নিলাম।”

সুরভীর মামা কৃষ্ণ রায় অভিযোগ করে জানায়, সুরভী আমাদের বাড়িতে থেকে লিখাপড়া করতো। সে স্কুলে ইতিহাস ও ভুগোলে প্রাইভেট না পড়ার কারনে দুই বিষয়ে ফেল দেখানো হয়। এ নিয়ে সুরভী মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল। যা তাকে ভুগোল শিক্ষকের দাড়া অপমানে তাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে। সুরভীর আত্মহত্যার খবরে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা বাড়িতে এসে শান্তনা দিয়ে বলে গেছেন সুরভী টেস্ট পরীক্ষায় পাস করেছে। কিন্তু এখন পাস দেখায় কি হবে মেয়েটিতো আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছে বলে তিনি কান্নাসুরে কথাটি বলেন। 

তিনি আরো জানান, তার ভাগ্নি পঞ্চম শ্রেনীর পিএসসির সমাপনী ও অষ্টম শ্রেনীর জেএসসি পরীক্ষায় এ প্লাস পেয়েছিল। সেখানে দশম শ্রেনীতে এসে সে টেস্ট পরীক্ষায় দুই বিষয়ে ফেল করতে পারে তা ভাবতে পারিনা আমরা।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভাগ্নি আত্মহত্যার আগে একটা চিঠি লিখে গেছে, সেখানে আত্মহত্যার জন্য কাউকে দায়ি করেনি। এখন শুনছি ভুগোলের শিক্ষকের কারনে সুরভী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। যদি তাই হয় তাহলে এর কঠোর বিচার চাইবো।

এদিকে আজ রবিবার (৫ নবেম্বর) দুপুর তিনটার দিকে স্কুল কর্তৃপক্ষ টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল ঘোষনা করে সুরভী সহ ২১৬ জন ছাত্রীকে পাস দেখিয়েছে।
ফলাফল ঘোষনার পর স্কুলের দশম শ্রেনীর সকল ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে থাকে তারা বিক্ষোভ মিছিল হতে ভুগোলের শিক্ষককে সুরভীর আত্মহত্যার জন্য দায়ি করে শ্লোগান দিয়ে বিচার দাবি করে। তারা মিছিল সহ সুরভীর বাড়িতে যায়। সেখানে তারা সকলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। এরপর বিক্ষোভ মিছিল সহ তারা শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে এসে বিকাল ৪টা হতে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে রাখে এ সময় শহরে যানজোটের সৃষ্টি হয়। পরে ঘটনাস্থলে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ও পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।
এ সময় ছাত্রীরা আগামীকাল সোমবার (৬ নবেম্বর) ডিসি অফিস ঘেরাও, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসুচি ঘোষনা করে চৌরঙ্গী মোড়ের স্বাধীনতা অম্লান স্মৃতি মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয়।

এ ব্যাপারে নীলফামারী সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শাহেরা বানুর সঙ্গে কথা বলতে গেলে তকে স্কুলে পাওয়া যায়নি। এ সময় স্কুলের পিয়ন মাজেদুল ইসলাম জানান, হেড আপা ডিসি স্যারের অফিসে গেছে। ওই সময় স্কুলের পিয়ন মাজদুল ইসলামকে বলতে শোনা যায় যে, যেই ছাত্রীরা আন্দোলনে রাস্তায় নেমেছে তাদের চিহিৃত করে দেখে নেয়া হবে। তারা এই সাহস পায় কই।
ডিসি অফিসে গিয়ে পাওয়া যায়, প্রধান শিক্ষিকাকে। তিনি বলেন আমি এ বিষয়ে কিছুই জানিনা। ডিসি স্যার বিষয়টি জানার জন্য ডেকেছিল। আমি ছাত্রীদের কাছ থেকে বিষয়টি যেনে বলতে পারবো।

অপর দিকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খলেদ রহীম বলেন, আমি প্রধান শিক্ষিকাকে ডেকে বিষয়টি জানতে চেয়েছি। কিন্তু তিনি পরিস্কার ভাবে আমাকে বলতে পারেনি। আমি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন ভুঁইয়াকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছি।

নীলফামারী সদর থানার ওসি বাবুল আকতার বলেন, মৃতদেহের পাশে একটি চিরকুট পাওয়া গেছে। যা সে আত্মহত্যার নমুনা উল্লেখ করে। চিঠিটি জব্দ করা হয়েছে।
তবে সুরভীর পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাদের কাছে হস্তান্তর করার আগে অপমৃত্যু একটি মামলা করা হয়। 

এদিকে সর্বশেষ খবরে জানা যায়, আজ রবিবার (৫ নবেম্বর) বিকালের মধ্যে সুরভীর গ্রামের বাড়ির শ্মশানে তার মরদেহ দাহ করা হয়েছে।



পুরোনো সংবাদ

নীলফামারী 2676597507592506965

অনুসরণ করুন

সর্বশেষ সংবাদ

কৃষিকথা

ফেসবুক লাইকপেজ

আপনি যা খুঁজছেন

গুগলে খুঁজুন

আর্কাইভ থেকে খুঁজুন

ক্যাটাগরি অনুযায়ী খুঁজুন

অবলোকন চ্যানেল

item